সোমবার ৩১ আগস্ট চাঁদপুর শহরের মদিনা শপিং কমপ্লেক্সে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানে ‘কসমেটিকস ওয়ার্ল্ড’ নামক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন অনিয়ম ও ভোক্তা অধিকার বিরোধী কর্মকাণ্ডের সত্যতা পাওয়া যায়। জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ইমরানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বিএসটিআইয়ের কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই বিদেশি কসমেটিকস পণ্য বাজারজাত করে আসছে। এছাড়া বিদেশি পণ্যের গায়ে আমদানিকারকের বাধ্যতামূলক স্টিকার না থাকা, বৈধ কাগজপত্রের অনুপস্থিতিতে লাগেজ পণ্যের বাণিজ্যিক প্রসার এবং পণ্য ক্রয়ের কোনো রশিদ সংরক্ষণ না করার মতো গুরুতর অপরাধগুলো উন্মোচিত হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছে। এই অভিযানের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য ও ভোক্তা সুরক্ষায় প্রশাসনিক কঠোর অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হিসেবে উঠে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিষয়টি। কোনো ধরনের একাডেমিক বা কারিগরি যোগ্যতা ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ত্বক ও কসমেটিকস পণ্যের ব্যবহার নিয়ে গ্রাহকদের পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের মতে, এমন অদক্ষ পরামর্শের কারণে সাধারণ গ্রাহকরা ভুল পণ্য ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদী চর্মরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন। এছাড়া, ক্রয়ের রশিদ প্রদান না করার ফলে কোনো পণ্য ব্যবহারের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে বা পণ্যটি ত্রুটিপূর্ণ প্রমাণিত হলে গ্রাহকদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছাদিউর রহমান ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম না করার অঙ্গীকার করলেও, ব্যবসায়িক মুনাফার লোভে ভোক্তাদের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার প্রবণতা স্থানীয় বাজারে চরম অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল এই প্রতিষ্ঠান নয়, মদিনা শপিং কমপ্লেক্সের অন্যান্য দোকানেও তদারকি চালানো হয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের আইন মেনে পণ্য বিক্রির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত এই অভিযানে ব্যবসায়ীদের ক্রয়-বিক্রয়ের রশিদ সংরক্ষণ এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে লিফলেট বিতরণ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের মতে, কেবল জরিমানা করে এই ধরনের অবৈধ বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, যদি না নিয়মিত মনিটরিং এবং কঠোর আইনি নজরদারি অব্যাহত থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বারবার অঙ্গীকারের পরেও একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থায়ী তদারকি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন ক্রেতারা।
এই অভিযানের ফলে চাঁদপুরের কসমেটিকস বাজারে এক ধরনের আতঙ্ক ও সতর্কবার্তা তৈরি হয়েছে। মূলত বিদেশি পণ্যের আড়ালে মানহীন ও অননুমোদিত কসমেটিকসের প্রসার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, আইন অমান্যকারী এবং প্রতারণামূলক ব্যবসায়িক চর্চার বিরুদ্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ভবিষ্যতে বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং ভোক্তাদের নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। জনস্বার্থ রক্ষায় এই কঠোর অবস্থান বজায় থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশেই কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।