মোবাইল ডেটা কোয়ালিটি: ৫জি'র স্বপ্ন বনাম গ্রাহকের বাস্তবতা ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মোবাইল ডেটা কোয়ালিটি: ৫জি'র স্বপ্ন বনাম গ্রাহকের বাস্তবতা ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
মোবাইল ডেটা কোয়ালিটি: ৫জি'র স্বপ্ন বনাম গ্রাহকের বাস্তবতা ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা
মোবাইল ডেটা কোয়ালিটি: ৫জি'র স্বপ্ন বনাম গ্রাহকের বাস্তবতা ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে মোবাইল ডেটা ব্যবহারের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি এবং একইসাথে ফাইভ-জি (5G) নেটও...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে মোবাইল ডেটা ব্যবহারের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি এবং একইসাথে ফাইভ-জি (5G) নেটওয়ার্ক স্থাপনার প্রাথমিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেছে। এই প্রতিবেদনে যদিও অপারেটরদের সম্প্রসারণের সদিচ্ছা প্রতিফলিত হয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে গ্রাহকদের ডেটা কোয়ালিটি নিয়ে অসন্তোষ এবং ফাইভ-জি'র উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষত, যখন 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশন বাস্তবায়নে ফাইভ-জিকে অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তখন গ্রাহকের দৈনন্দিন ডেটা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এবং ফাইভ-জি'র স্বপ্নের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে গভীর পর্যবেক্ষণে বাধ্য করছে।

ফাইভ-জি প্রযুক্তির মূল প্রতিজ্ঞা হলো অতি উচ্চ গতি, অতি নিম্ন লেটেন্সি এবং ব্যাপক ডিভাইস সংযোগের ক্ষমতা, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করবে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ডেটা আদান-প্রদান, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশনগুলো নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) 'স্মার্ট বাংলাদেশ' রোডম্যাপে এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ওপর জোর দিয়েছে, যেখানে স্মার্ট সিটি, স্মার্ট কৃষি, দূরশিক্ষণ, টেলিমেডিসিন এবং স্বায়ত্তশাসিত যানবাহনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে ফাইভ-জি'র ভূমিকা অপরিসীম। বিটিআরসি ইতিমধ্যে অপারেটরদের জন্য ফাইভ-জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ করেছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে এর সেবা চালু করার অনুমতি দিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো তাত্ত্বিকভাবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও, অপারেটরদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিশেষ করে ফাইবার অপটিক ব্যাকবোন নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণে ধীরগতি এবং টাওয়ার ডেনসিটি বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জগুলো ফাইভ-জি'র পূর্ণ সম্ভাবনাকে আটকে রাখছে। গ্রাহকরা এখনো উচ্চ ডেটা প্ল্যান কিনেও কাঙ্ক্ষিত গতি বা নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাচ্ছেন না, যা তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে এবং ফাইভ-জি'র প্রতি প্রাথমিক আগ্রহকে শীতল করে দিচ্ছে।

মোবাইল ডেটা কোয়ালিটির এই চ্যালেঞ্জ শুধু গ্রাহক অসন্তোষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অগ্রগতিতেও বাধা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে, যা স্থানীয় সফটওয়্যার ও আইটি পরিষেবা খাতের উন্নয়নে অপরিহার্য। দুর্বল ইন্টারনেট কোয়ালিটির কারণে ক্লাউড-ভিত্তিক পরিষেবা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং এআই-চালিত অ্যাপ্লিকেশনগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা উদ্ভাবনী স্টার্টআপ এবং এসএমইগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু দুর্বল মোবাইল ডেটা কোয়ালিটি এই উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতাকে সীমিত করছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায়, যেখানে ফাইবার অপটিক অবকাঠামো এখনো অপ্রতুল, সেখানে মোবাইল ডেটার ওপরই নির্ভর করতে হয়, কিন্তু সেখানেও ৪জি বা ৩জি সেবার মান প্রায়শই হতাশাজনক। এই অবস্থা ডিজিটাল বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' এর অন্তর্ভুক্তিমূলক লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) পরিচালিত বিভিন্ন হাইটেক পার্কে আন্তর্জাতিক মানের সংযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, বাইরের সাধারণ নেটওয়ার্কের দুর্বলতা সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসি'র ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোয়ালিটি অফ সার্ভিস (QoS) রেগুলেশনস, ২০১৮ অনুযায়ী অপারেটরদের নির্দিষ্ট মান বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, এর কঠোর প্রয়োগের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অপারেটররা বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়, রাইট-অফ-ওয়ে সমস্যা এবং বিদ্যুতের মতো মৌলিক অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কথা বললেও, গ্রাহকের মানসম্মত সেবা পাওয়ার অধিকারকে কোনো অজুহাতেই অস্বীকার করা যায় না। ফাইভ-জি অবকাঠামো স্থাপনে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডের ব্যবহার, যা স্বল্প দূরত্বে দ্রুত ডেটা প্রেরণ করতে পারে কিন্তু দেয়াল ভেদ করতে পারে না, এর জন্য আরও বেশি সংখ্যক ছোট সেল (small cells) এবং টাওয়ারের প্রয়োজন হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্যাসিভ অবকাঠামো শেয়ারিং এবং কো-লোকেশন নীতি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সরকার ও অপারেটরদের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে ফাইভ-জি'র স্বপ্ন কেবল উচ্চ-প্রযুক্তির একটি শ্লোগান হয়েই থাকবে, গ্রাহকের বাস্তবতায় এর সুফল পৌঁছাবে না।

সূচক ২০২২ সালের চতুর্থ প্রান্তিক ২০২৩ সালের চতুর্থ প্রান্তিক
মোট মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক (কোটি) ১২.৪৩ ১২.৯৩
মোট ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহক (লক্ষ) ১.২৫ ১.৪০
গড় ৪জি ডাউনলোড স্পিড (এমবিপিএস) ৮.৯ ১০.২
৫জি পরীক্ষামূলক কভারেজ (শহরের %) ০.৫ ১.৫
মোবাইল ডেটা ব্যবহার (জিবি/মাস/গ্রাহক) ৬.৮ ৭.৫

উৎস: বিটিআরসি বার্ষিক প্রতিবেদন ও ওপেনসিগনাল/ওকলা ডেটা (আনুমানিক)

সুপারিশ

  • বিটিআরসিকে 'কোয়ালিটি অফ সার্ভিস রেগুলেশনস, ২০১৮' সংশোধন করে ৫জি সেবার জন্য সুনির্দিষ্ট পারফরম্যান্স প্যারামিটার এবং শাস্তিমূলক বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একইসাথে, বিটিআরসি একটি পাবলিক, রিয়েল-টাইম QoS মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালু করবে যেখানে অপারেটরদের ডেটা কোয়ালিটি সংক্রান্ত তথ্য এবং গ্রাহক অভিযোগের পরিসংখ্যান স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা হবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) যৌথভাবে 'জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতি'র অধীনে ফাইবার অপটিক ব্যাকবোন নেটওয়ার্কের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং প্যাসিভ অবকাঠামো শেয়ারিং নীতিকে বাধ্যতামূলক করার জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করবে। BHTPA পরিচালিত হাইটেক পার্কগুলোতে অপারেটরদের জন্য কো-লোকেশন এবং রাইট-অফ-ওয়ে সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় সাধন করবে।
  • বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামকে একত্রে কাজ করতে হবে ৫জি-অপ্টিমাইজড স্থানীয় অ্যাপ্লিকেশন ও কনটেন্ট ডেভেলপমেন্টের জন্য একটি ইনোভেশন ফান্ড তৈরি করতে। এই ফান্ড ব্যবহার করে স্টার্টআপদের ৫জি'র পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সেবা তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে, যা উচ্চ-গতির ইন্টারনেটের চাহিদা এবং ব্যবহারিক উপযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator