সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) কর্তৃক প্রকাশিত 'ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৪' ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবর্তিত হতে পারে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং অটোমেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রতিবেদন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ দেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে প্রযুক্তির দ্রুত অভিযোজন একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, তেমনি অন্যদিকে প্রথাগত কর্মসংস্থান এবং প্রচলিত দক্ষতার ক্ষেত্রে এক গভীর সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে, পোশাক শিল্প, কৃষি এবং পরিষেবা খাতের মতো শ্রমঘন শিল্পগুলোতে স্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে লাখ লাখ কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR) কেবল কিছু নতুন প্রযুক্তির সমাহার নয়, এটি উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসন প্রক্রিয়ার এক মৌলিক রূপান্তর। রোবোটিক্স, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ব্লকচেইনের মতো প্রযুক্তিগুলো শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পে, ধীরে ধীরে এআই-চালিত রোবট এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের ব্যবহার বাড়ছে, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করলেও বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কাজ কেড়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, পোশাক কারখানায় কাপড় কাটা, সেলাই এবং প্যাকেজিংয়ের মতো কাজে রোবটের ব্যবহার বাড়ছে, যা ঐতিহ্যবাহী শ্রমিকের চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সাথে, নতুন ডেটা অ্যানালিস্ট, এআই ইঞ্জিনিয়ার, রোবোটিক্স টেকনিশিয়ান এবং সাইবারসিকিউরিটি বিশেষজ্ঞের মতো উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন পেশার চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পর্যাপ্ত সংখ্যক এমন দক্ষ কর্মী তৈরি হচ্ছে না। এর ফলে, একদিকে যেমন বহু মানুষ বেকার হচ্ছে, অন্যদিকে শিল্প খাত প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের অভাবে ভুগছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক চাহিদার সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক পরিচালিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচলিত পাঠ্যক্রমগুলো প্রায়শই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা যেমন ক্রিটিক্যাল থিংকিং, সমস্যা সমাধান, ডেটা সায়েন্স, এআই এবং কোডিং অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব এবং আধুনিক ল্যাব সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী জ্ঞান ও হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET) তালিকাভুক্তি এখনও মোট শিক্ষার্থীর একটি ছোট অংশ, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এর ফলে, প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যে বিপুল সংখ্যক স্নাতক বের হচ্ছেন, তাদের অনেকেরই আধুনিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা নেই। এটি কেবল বেকারত্ব বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের মেধাবী তরুণদের বিদেশে কর্মসংস্থান খুঁজতে বাধ্য করছে, যা মেধা পাচারের কারণ হচ্ছে।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের কার্যক্রমের পরিধি এবং আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া এখনও যথেষ্ট নয়। NSDA জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়নে কাজ করলেও, শিল্প খাতের সাথে তাদের সংযোগ আরও সুদৃঢ় করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় 'ফোর-আইআর স্কিলস' যেমন অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন, রোবোটিক্স এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের উপর জোর দিয়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম ঢেলে সাজানো জরুরি। সরকার কর্তৃক পরিচালিত স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মতো প্রকল্পগুলো আধুনিক দক্ষতা প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করছে, তবে এর আওতা বৃদ্ধি এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা আবশ্যক। বিদ্যমান প্রশিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞানদান এবং প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিল্প-কারখানার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে ইন্টার্নশিপের সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে থাকা শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত 'রিস্কিলিং' ও 'আপস্কিলিং' প্রোগ্রামের আয়োজন করা প্রয়োজন, যাতে তারা নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং তাদের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকে।
| সূচক | ২০২৩ সালের তথ্য (প্রাক্কলিত) | ২০২৭ সালের পূর্বাভাস (WEF) |
|---|---|---|
| উচ্চশিক্ষা স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার | ৩২% | ৩০% (যদি বিদ্যমান দক্ষতা অপরিবর্তিত থাকে) |
| ৪র্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী দক্ষ জনবলের অনুপাত | ১৫% | ২৫% (লক্ষ্যমাত্রা) |
| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন দ্বারা প্রভাবিত কর্মসংস্থান | ২০ লক্ষ | ৪০ লক্ষ |
| কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর হার | ১৭% | ২৫% (লক্ষ্যমাত্রা) |
উৎস: জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর যৌথ সমীক্ষা, ২০২৪ (প্রাক্কলিত) ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) এর ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৪ এর ভিত্তিতে।
সুপারিশ
- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর তত্ত্বাবধানে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম দ্রুত আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স, রোবোটিক্স এবং সাইবারসিকিউরিটি বিষয়ে বাধ্যতামূলক মডিউল ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি, শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উপদেষ্টা পর্ষদ দ্বারা নিয়মিত পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও হালনাগাদ নিশ্চিত করতে হবে।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মাধ্যমে একটি জাতীয় 'রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং' কাঠামো তৈরি করতে হবে। এই কাঠামোর আওতায় শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে কর্মক্ষেত্রে থাকা শ্রমিকদের জন্য সরকারি ভর্তুকি এবং দক্ষতার সনদ প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। বিশেষত, পোশাক শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতের শ্রমিকদের জন্য নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
- বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এবং আইসিটি বিভাগকে সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী 'শ্রমবাজার তথ্য ব্যবস্থা' (Labor Market Information System - LMIS) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা, দক্ষতার ঘাটতি এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের প্রবণতা সম্পর্কে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করতে হবে, যা নীতি নির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় সহায়তা করবে।