প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

তৌহিদুর রহমান  avatar   
তৌহিদুর রহমান
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত

প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'সাউথ এশিয়া'স প্লাস্টিক ক্রাইসিস: সলিউশনস ফর অ্যা সার্কুলার ইকোনমি' শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে ২০১৯ সালে ৯ কেজিতে উন্নীত হয়েছে, যা দেশের দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের একটি প্রত্যক্ষ ফল। একইসাথে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৩,০০০ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশ ও জলজ বাস্তুতন্ত্রে মিশে যাচ্ছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, এই ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণ কি কেবল নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা, নাকি একটি দুর্বল ও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থার ফল?

বাংলাদেশের প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এই শিল্প রপ্তানি আয়েও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, খাদ্য ও পানীয়, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এই খাত বার্ষিক প্রায় ১০-১২% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তবে, এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক কালো দিক রয়েছে – অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। যদিও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন সময় বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যেমন 'প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২০', এর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা ও দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, বহুবার একক-ব্যবহারের প্লাস্টিক (single-use plastic) নিষিদ্ধ করার ঘোষণা এলেও, বাজারজুড়ে এর অবাধ ব্যবহার এখনো চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে এই বিধিমালাগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য কেবল নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয়কে দায়ী করা যায় না; বরং এটি একটি বহুমুখী সমস্যা যা আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিটি স্তরেই বিদ্যমান। শিল্প বিকাশকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকার একটি সুসংহত এবং কার্যকর কৌশল প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কেবল আইন ও নীতির প্রয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর গভীরতর কারণ রয়েছে আমাদের সামগ্রিক সিস্টেমের মধ্যে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু তাদের কাছে আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট, পর্যাপ্ত জনবল এবং বর্জ্য পৃথকীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। ফলে, প্লাস্টিক বর্জ্য অন্যান্য বর্জ্যের সাথে মিশে যায়, যা পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তোলে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বাংলাদেশকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করেছে, যেমন 'সিটি এনভায়রনমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট' বা 'সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট'। কিন্তু এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে প্রায়শই ব্যাপক ফারাক দেখা যায়। প্রকল্পের অর্থায়ন সঠিকভাবে ব্যবহার না হওয়া, দুর্নীতির অভিযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ের সক্ষমতার অভাব এই প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা হ্রাস করেছে। উপরন্তু, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক শিল্পের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক ও শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ পুনর্ব্যবহার কাজ অনানুষ্ঠানিক খাতে সীমিত থাকে, যেখানে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করা হয় এবং পরিবেশগত মান বজায় রাখা হয় না। এই খাতের অনানুষ্ঠানিকতা সরকারকে কার্যকরভাবে এটিকে নিয়ন্ত্রণ বা সহায়তা করতে বাধা দেয়, যা একটি বিশাল সম্ভাবনাময় খাতকে অব্যবহৃত রেখে দেয় এবং একই সাথে পরিবেশ দূষণ অব্যাহত রাখে। প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্য উদ্ভাবন ও ব্যবহারে বিনিয়োগের অভাবও একটি বড় সমস্যা। গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ের বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত, যার ফলে নতুন, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং উপাদানের প্রচলন ধীর গতিতে চলছে।

এই সামগ্রিক দুর্বলতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নদী, খাল, বিল এবং সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণ মৎস্য সম্পদের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, যা দেশের মৎস্যজীবী ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে। বঙ্গোপসাগরে প্লাস্টিক দূষণ পর্যটন শিল্পকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। স্বাস্থ্য খাতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে দূষণ প্রবেশ করছে, যা মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদী রোগের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এই সমস্যা মোকাবিলায় কিছু উদ্যোগ নিলেও, তার গতি ও পরিধি যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা' (National Solid Waste Management Policy) এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এই নীতিমালায় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব সুস্পষ্ট। ফলে, আমাদের নদীগুলো প্লাস্টিকের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে এবং ভূমি প্লাস্টিক দ্বারা দূষিত হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনকেও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে। এই শিল্পের স্থায়িত্বশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে কেবল উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, বরং এর পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ও সুসংহত ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটও বটে, যার সমাধান না হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তথ্য
সূচক তথ্য সাল/সময়কাল উৎস
মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ৯ কেজি ২০১৯ World Bank
প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন (ঢাকা শহর) প্রতিদিন প্রায় ৩,০০০ টন ২০২০-২০২১ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ
প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার হার (আনুমানিক) ২০-২৫% ২০১৯-২০২০ বাংলাদেশ সরকার (পরিবেশ অধিদপ্তর)
পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য যা সংগ্রহ হয় না ৫০-৬৯% ২০১৯ World Bank
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ADB প্রদত্ত ঋণ $১০০ মিলিয়ন (বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে) ২০১৫-২০২২ এডিবি (Asian Development Bank)
প্লাস্টিক বর্জ্য দ্বারা দূষিত নদীর সংখ্যা (প্রধান নদীসমূহ) প্রায় ১০-১২টি (গুরুত্বপূর্ণভাবে) ২০১৮-২০২২ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

উৎস: World Bank, বাংলাদেশ সরকার (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়), এডিবি (Asian Development Bank)

সুপারিশ

  • প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের জন্য 'বর্ধিত উৎপাদক দায়িত্ব' (Extended Producer Responsibility - EPR) বাধ্যতামূলক করা হোক। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে 'প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২০' এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর EPR ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যেখানে প্লাস্টিক উৎপাদকদের পণ্যের জীবনচক্রের শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরকে এর বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
  • প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হোক। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ সরকারের বাজেট থেকে এবং বিশ্বব্যাংক ও এডিবি-এর সহায়তায় প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও প্রধান পৌরসভায় অত্যাধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ প্ল্যান্ট ও পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এই খাতে বিনিয়োগের জন্য সবুজ অর্থায়ন (green financing) নীতিমালা প্রণয়ন ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং উপকরণ ও প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করা হোক। শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি 'প্লাস্টিক বিকল্প উদ্ভাবন তহবিল' গঠন করতে হবে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক, কাগজভিত্তিক প্যাকেজিং এবং অন্যান্য টেকসই বিকল্পের উন্নয়নে গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার জন্য উৎসাহিত ও অর্থায়ন করতে হবে, যাতে দেশীয়ভাবে পরিবেশবান্ধব সমাধানের বিকাশ ঘটে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তৌহিদুর রহমান

তৌহিদুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator