সময়ের স্রোতে মানুষের জীবনের উত্থান ও পতনের যে অনিবার্য বাস্তবতা, তা সাম্প্রতিক এক আলোচনায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন সার্ক মানবাধিকার সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি জাফর ইকবাল। তিনি সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে বীরদর্পে চলা জাহাজের সাথে মানবিক জীবনের তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়ে একসময়ের প্রভাবশালী জাহাজ তীরে আটকা পড়ে অকেজো হয়ে পড়ে, তেমনি মানুষের জীবনের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী পর্যায়ও সময়ের অমোঘ নিয়মে স্থবির হয়ে যেতে পারে। মূলত ক্ষমতার দাপটে অন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করেই তিনি এই সতর্কবার্তার অবতারণা করেছেন। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে তিনি এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যখন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অহংবোধের চর্চা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতা ও সম্পদকে চিরস্থায়ী মনে করার যে মানসিক ভ্রান্তি, তা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদই ছিল তার বক্তব্যের মূল উপজীব্য।
ভুক্তভোগী বা সাধারণ মানুষের প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে দেখা যায়, সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অহংবোধের কারণে প্রান্তিক মানুষ প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে। জাফর ইকবাল তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, সমাজের উচ্চস্তরে যারা অবস্থান করছেন, তারা অনেক সময় সাধারণ মানুষের মানবিক প্রয়োজনগুলোকে অবজ্ঞা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি তার ক্ষমতার শীর্ষে থাকেন, তখন তিনি তার চারপাশের মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করেন, যা আদতে এক ধরনের সামাজিক বিচ্যুতি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতাধরদের এই দম্ভ শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি ঘটায় না, বরং প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষকে চরম হয়রানির মুখে ঠেলে দেয়। তার মতে, ক্ষমতার এই দাপট যখন চরমে পৌঁছায়, তখন মানুষ তার নিজের অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতা ভুলে যায়, যা পরিণামে ব্যক্তিজীবনকে নিঃসঙ্গ ও অর্থহীন করে তোলে। এই বাস্তবতাকে তিনি তীরে আটকে পড়া জাহাজের সাথে তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে মানুষ কতটা অসহায় ও নতজানু হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া ও পরিস্থিতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাফর ইকবালের এই আহ্বানকে কেবল নৈতিক উপদেশ হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং একে বর্তমান সামাজিক কাঠামোর একটি বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ক্ষমতার দাপট কমিয়ে মানবিক মূল্যবোধ চর্চার যে দাবি তিনি তুলেছেন, তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। দায়িত্বশীল মহলের মতে, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও বিনয়ী আচরণই কেবল জীবনের অন্তিম সময়ে প্রকৃত সম্পদ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতা ও অর্থের মোহে আচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থায় এই নৈতিক চর্চা কতটা কার্যকর হবে? প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা আছেন, তাদের উচিত এই ধরনের বার্তার আলোকে নিজেদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করা। জাফর ইকবাল স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ব্যক্তিই সময়ের ঊর্ধ্বে নন, তাই সুসময়কে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার মাধ্যমে যে সামাজিক পুঁজি গড়ে ওঠে, তা-ই দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব বিস্তার করে।
পরিশেষে বলা যায়, ক্ষমতার দম্ভ ও অহংকারমুক্ত জীবন গঠনের এই বার্তা বর্তমান অস্থির সমাজে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মানুষের যাতায়াত, পেশাগত জীবন কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অহংবোধের যে দেয়াল তৈরি হয়েছে, তা ভেঙে ফেলার মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়া সম্ভব। জাফর ইকবালের এই বিশ্লেষণ কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি সমষ্টিগত পরিবর্তনের একটি আহ্বান। যদি ক্ষমতার দাপট কমিয়ে মানুষ একে অপরের প্রতি মানবিক সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে শেখে, তবেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ প্রকৃত প্রশান্তি খুঁজে পাবে। নশ্বর জীবনের এই সংক্ষিপ্ত যাত্রাপথে অহংকার নয়, বরং জনকল্যাণই যে একমাত্র ধ্রুব সত্য, তা পুনরায় প্রমাণিত হলো এই আলোচনার মাধ্যমে।