এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

মাহমুদুল হাসান  avatar   
মাহমুদুল হাসান
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের খাদ্য উৎপাদন ১৫% বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যেখানে এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফা...

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের খাদ্য উৎপাদন ১৫% বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যেখানে এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিংকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী এবং বর্তমান কৃষিব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। একদিকে যেমন স্মার্ট সেন্সর, ড্রোন, আইওটি-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং নির্ভুল সেচ পদ্ধতির মতো আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি মাঠপর্যায়ে এর ধীরগতি ও সীমিত প্রবেশাধিকার নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি বিদ্যমান কৃষি ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার ফল, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে এগ্রি-টেক ব্যবহারের হার এখনো ৫ শতাংশের নিচে, যা প্রযুক্তির সুফল বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা।

এগ্রি-টেক ও স্মার্ট ফার্মিংয়ের অপার সম্ভাবনা বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল এবং লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাতগুলো যদি নির্ভুল কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষ করা হয়, তাহলে ফলন আরও বাড়ানো সম্ভব। মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টি উপাদান এবং ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে স্মার্ট সেন্সর ব্যবহার করে সারের অপচয় কমানো এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা যায়, যা কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। একইভাবে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উদ্ভাবিত বিভিন্ন সবজি ও ফলের উন্নত জাতগুলির জন্য স্মার্ট গ্রিনহাউস বা উল্লম্ব খামার পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিকূল আবহাওয়াতেও উচ্চমানের উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু এই প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও উদ্ভাবন কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত এবং নীতিগত দুর্বলতা প্রকট। ইন্টারনেট সংযোগের অভাব, বিদ্যুৎ সংকট এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ছোট কৃষকদের জন্য স্মার্ট ফার্মিংকে একটি বিলাসবহুল বিষয় করে রেখেছে, যা তাদের নাগালের বাইরে।

এই প্রযুক্তির ধীরগতি কেবল নীতি প্রণেতাদের দূরদৃষ্টির অভাব বা অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফল নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও নির্দেশ করে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন DAE, BARI, BRRI এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC), গবেষণা ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রায়শই দেখা যায়। BARC-এর গবেষণালব্ধ জ্ঞান DAE-এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে বিলম্ব হয় এবং অনেক সময় তা কৃষকদের ব্যবহার উপযোগী করে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য প্রযুক্তি সহজলভ্য করার জন্য বিশেষ তহবিল বা ভর্তুকি নীতির অভাব একটি বড় সমস্যা। স্মার্ট ফার্মিংয়ের প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় বেশি হওয়ায় কৃষকরা ঋণ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হন, এবং প্রচলিত ব্যাংক ঋণের শর্তাবলী তাদের জন্য প্রায়শই কঠিন হয়। এছাড়াও, `পরিবেশ মন্ত্রণালয়` জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি এবং টেকসই চাষাবাদের উপর জোর দিলেও, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণের অভাব কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে।

প্রযুক্তির ধরন ২০২০ সালে কৃষক পর্যায়ে গ্রহণ (%) ২০২৩ সালে কৃষক পর্যায়ে গ্রহণ (%) ২০৩০ সালের DAE লক্ষ্যমাত্রা (%)
স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা (ড্রিপ/স্প্রিংকলার) ২.৫% ৪.০% ১৫.০%
মাটি পরীক্ষা কিট/সেন্সর ১.৮% ৩.৫% ১২.০%
আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি পরামর্শ অ্যাপ ৪.২% ৬.৫% ২০.০%
ড্রোন/রিমোট সেন্সিং (ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ) ০.১% ০.৩% ৫.০%
সৌরশক্তি চালিত কৃষি সরঞ্জাম ৩.০% ৫.৫% ১০.০%

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর বিভিন্ন প্রতিবেদন (২০২০-২০২৩) থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে অনুমানিক চিত্র।

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয়কে বিদ্যমান `জাতীয় কৃষি নীতি` সংশোধন করে একটি সুনির্দিষ্ট 'এগ্রি-টেক ও স্মার্ট ফার্মিং উন্নয়ন কৌশলপত্র' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে প্রযুক্তি ক্রয় ও প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ ভর্তুকি এবং সহজলভ্য ঋণের ব্যবস্থা থাকবে। এই কৌশলপত্রে BARC-এর মাধ্যমে BRRI ও BARI-এর গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য DAE-কে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে।
  • DAE-কে প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি 'স্মার্ট ফার্মিং প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' স্থাপন করতে হবে, যেখানে কৃষকরা সরাসরি আধুনিক প্রযুক্তি যেমন স্মার্ট সেচ, ড্রোন ব্যবহার এবং মাটি পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে হাতে-কলমে শিখতে পারবেন। এই কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণের জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে সফল কৃষকদের `কৃষি ঋণ নীতিমালা` এর আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে `জাতীয় পরিবেশ নীতি` ও `জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা` এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে 'জলবায়ু সহনশীল স্মার্ট কৃষি' প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। এই তহবিল থেকে DAE, BARI এবং BRRI-এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব এগ্রি-টেক যেমন সৌরশক্তি চালিত পাম্প, বায়োচার উৎপাদন এবং নির্ভুল সার প্রয়োগ পদ্ধতির গবেষণা ও বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator