বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম  avatar   
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম
বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত
গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এর পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য ৮.৪ শতাংশ বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্ব...

গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এর পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য ৮.৪ শতাংশ বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের ঘটনা, দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট কতটা গভীর, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল একটি মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা নয়, বরং দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আমদানিনির্ভরতার এক কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। বিশেষত, গ্যাস সংকটের কারণে বেশ কিছু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানি করতে না পারার প্রেক্ষাপটে এই মূল্যবৃদ্ধি ছিল অনিবার্য। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জনজীবন পর্যন্ত বিস্তৃত।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস অয়েল এবং কয়লার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে প্রায় ৫০-৫৫% বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, যার একটি বড় অংশ এখন আমদানিকৃত LNG দ্বারা পূরণ করা হয়। দেশের নিজস্ব গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৩ সালের প্রথম নয় মাসে, আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ২০-৩০ ডলারে পৌঁছানোর ফলে বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি আমদানি ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে ফার্নেস অয়েল ও কয়লার আমদানি ব্যয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রায়শই ডলারের সংস্থান করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যার ফলে অনেক সময় চাহিদামাফিক জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলস্বরূপ, প্রায় ১২,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ। এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় স্থাপিত অনেক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারলেও তাদের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। World Bank এর এক সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ক্যাপাসিটি পেমেন্টগুলো BPDB-এর বার্ষিক লোকসানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে, যা সরকারের উপর ভর্তুকির চাপ বাড়াচ্ছে।

এই জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে অনেক শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা রপ্তানি আদেশ পূরণে বিলম্ব ঘটাচ্ছে এবং উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, গার্মেন্ট, সিরামিকস এবং ইস্পাত শিল্পের মতো জ্বালানি-নির্ভর খাতগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার একদিকে যেমন ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে BPDB-এর ক্রমবর্ধমান লোকসান দেশের বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ বাড়ানোর কথা বললেও, এর বাস্তবায়ন গতি খুবই ধীর। বর্তমানে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ থেকে জাতীয় গ্রিডে যোগানের পরিমাণ মাত্র ৩-৪%। যদিও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০২৫ সালের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা, যা দেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতায় একটি বড় পরিবর্তন আনবে, কিন্তু এর নির্মাণ খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলো এখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ADB এর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধুমাত্র উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, বরং জ্বালানি মিশ্রণে বৈচিত্র্য আনা এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড অবকাঠামোও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পুরোনো ও দুর্বল সঞ্চালন এবং বিতরণ লাইনগুলো প্রায়শই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ হয় এবং সিস্টেম লস (System Loss) বাড়িয়ে দেয়। Power Grid Company of Bangladesh (PGCB) সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে কাজ করলেও, দ্রুত বর্ধনশীল বিদ্যুৎ চাহিদা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো অনিয়মিত উৎসগুলোকে গ্রিডে কার্যকরভাবে একীভূত করার জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন। বর্তমানে, বিদ্যুৎ সঞ্চালনে প্রায় ৩% এবং বিতরণে প্রায় ৮-১০% সিস্টেম লস হয়, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ সরকার প্রণীত Power System Master Plan (PSMP) অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ৪০% এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, বর্তমান বাস্তবায়ন গতিতে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। গ্রিডের স্মার্ট সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ অপরিহার্য, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির অস্থিরতাকে সামাল দিতে সাহায্য করবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ উৎস অনুসন্ধান এবং উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করা যেমন জরুরি, তেমনি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে স্বল্প খরচে বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগগুলোও কাজে লাগানো যেতে পারে। এক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও বিস্তৃত করতে হবে, বিশেষ করে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

জ্বালানির ধরন বিদ্যুৎ উৎপাদনে অংশ (২০২২-২৩ অর্থবছর)
প্রাকৃতিক গ্যাস ৪৮%
ফার্নেস অয়েল (HFO) ২৩%
কয়লা ১০%
আমদানিকৃত বিদ্যুৎ ৭%
ডিজেল ৪%
জলবিদ্যুৎ ২%
সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য ৩%

উৎস: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক সম্প্রসারণ: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম আইন, ১৯৭৪ এর অধীনে পেট্রোবাংলাকে onshore ও offshore ব্লকগুলোতে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কার্যক্রম দ্রুততর করতে হবে। একই সাথে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০০৮ (সংশোধিত) এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ অন্তত ২০% এ উন্নীত করার জন্য সুনির্দিষ্ট, সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে ইউটিলিটি-স্কেল সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হবে।
  • গ্রিড আধুনিকীকরণ ও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি: Power Grid Company of Bangladesh (PGCB) কে World Bank এবং ADB এর সহায়তায় স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি এবং উন্নত সঞ্চালন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে হবে যাতে সিস্টেম লস হ্রাস পায় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনিয়মিত উৎপাদনকে দক্ষতার সাথে গ্রিডে একীভূত করা যায়। বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ এর আওতায় শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে জ্বালানি নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) কে কঠোর নজরদারি ও প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
  • আর্থিক কাঠামোগত সংস্কার ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পুনর্গঠন: বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে BPDB এর আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো (PPAs) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে অচল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা কমাতে হবে। World Bank বা ADB এর কারিগরি সহায়তায় একটি সমন্বিত আর্থিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যা বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অনুযায়ী যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং সরকারি ভর্তুকির উপর নির্ভরতা কমানোর পথ দেখাবে, যা বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ এর উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator