দেশের সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে যে নিয়মিত ঘুষের কবলে পড়তে হয়, তার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও তথ্যভিত্তিক চিত্র তুলে ধরতে গত ২১ আগস্ট যাত্রা শুরু করেছে ঘুষসাইট নামের একটি ওয়েব প্ল্যাটফর্ম। সাইফ কবির ও সাহেদ শরীফ নামের দুই তরুণ উদ্যোক্তার উদ্ভাবিত এই ওয়েবসাইটটি মূলত একটি ক্রাউডসোর্সিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা কোনো প্রকার পরিচয় গোপন না করেই তাদের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে পারছেন। ওয়েবসাইটটির মূল স্লোগান হলো দপ্তরের নাম, দাবিকৃত টাকার পরিমাণ এবং সেবার ধরন উল্লেখ করা, তবে এখানে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম বা ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়নি। মূলত ভারতের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র একদিনের প্রচেষ্টায় তৈরি করা এই সাইটটি সরকারি দপ্তরের অনিয়মের একটি উন্মুক্ত লেজার বা পাবলিক রেকর্ড তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, যা সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ঘুষের সুনির্দিষ্ট অংক সম্পর্কে ধারণা দেবে।
ওয়েবসাইটটি চালুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দেশজুড়ে সরকারি সেবার ক্ষেত্রে ঘুষের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটটি বিভাগ থেকে ৪৫৮টি রিপোর্ট জমা পড়েছে, যেখানে দাবিকৃত ঘুষের মোট পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যমতে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৫৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে, এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগের মতো এলাকাগুলো। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, পাসপোর্ট অফিস থেকে শুরু করে ভূমি অফিস বা ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রেও একটি অদৃশ্য কিন্তু সুনির্ধারিত ঘুষের সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন কোনো দপ্তরে যান, তখন তারা জানেন না তাদের কাছে কত টাকা দাবি করা হতে পারে বা চাওয়া টাকাটি স্বাভাবিক হারের চেয়ে বেশি কি না। এই প্ল্যাটফর্মটি সেই তথ্যের শূন্যতা পূরণ করে সেবাগ্রহীতাদের আগে থেকেই প্রস্তুত থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে, যাতে তারা অযৌক্তিক বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেন।
প্ল্যাটফর্মটির নির্মাতারা জানিয়েছেন যে, ওয়েবসাইটটিতে প্রকাশিত তথ্যগুলো সরাসরি ব্যবহারকারীদের দেওয়া এবং এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাইকৃত নয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে এটি আইনি প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে না, বরং এটি একটি প্যাটার্ন বা প্রবণতা বিশ্লেষণের উৎস হিসেবে কাজ করবে। সাইফ কবিরের মতে, বড় অংকের কিছু ঘুষের দাবির কারণে গড় হিসাব কিছুটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে এটি সরকারি সেবার মান ও দুর্নীতির ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মের তথ্যের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের ডিজিটাল উদ্যোগ দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি কমাতে এ ধরনের ডেটা-চালিত নজরদারি ব্যবস্থা ভবিষ্যতে সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘুষসাইটের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর বিস্তার সরকারি খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নীরব প্রতিবাদের একটি নতুন মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে দুর্নীতির প্যাটার্ন উন্মোচন করা এবং সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে তথ্য শেয়ার করার এই প্রবণতা ভবিষ্যতে পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো অন্যান্য সেবা খাতেও প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে সচেতন করছে, অন্যদিকে সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়বদ্ধতার ভয় তৈরি করছে। যদি এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবেই কেবল প্রকৃত অর্থে সরকারি সেবার মানোন্নয়ন ও দুর্নীতি হ্রাস করা সম্ভব হবে, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আরও সহজ ও ভোগান্তিমুক্ত করবে।