বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ফারহান ফুয়াদ  avatar   
ফারহান ফুয়াদ
বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাথরিন তাইয়ের সম্প্রতি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সফর এবং একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সংলাপে চীনের বাণিজ্য নীতি নিয়ে উদ...

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাথরিন তাইয়ের সম্প্রতি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সফর এবং একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সংলাপে চীনের বাণিজ্য নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। ওয়াশিংটন শুধু নিজেদের ভূখণ্ডে নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য বলয়েও বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এই কৌশলগত পদক্ষেপগুলো কেবল বাণিজ্য ঘাটতির পুরনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে দুই পরাশক্তির মধ্যে প্রচ্ছন্ন স্নায়ুযুদ্ধের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন কেবল শুল্ক আরোপ বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি প্রযুক্তিগত আধিপত্য, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি জটিল রণনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। ওয়াশিংটন 'ডিকাপলিং' বা 'ডি-রিস্কিং' নীতির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি যেমন সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জৈবপ্রযুক্তি খাতে চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে। এর অংশ হিসেবে মার্কিন চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্টের মতো আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে এবং মিত্র দেশগুলোকে চীনের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে কোটি কোটি ডলারের ভর্তুকি প্রদান করছে। অন্যদিকে, চীন তার 'ডুয়াল সার্কুলেশন' কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, যার লক্ষ্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন করা, যাতে বাইরের চাপ মোকাবিলা করা যায়। এই দুই দেশের কৌশলগত পদক্ষেপগুলো বিশ্বব্যাপী উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে নতুন করে সাজাতে বাধ্য করছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-এর মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোকেও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে, যেখানে নিয়ম-ভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের এই প্রভাব কেবল বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও গভীর ছাপ ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে শক্তিশালী করতে কোয়াড (Quad) এবং অকাস (AUKUS)-এর মতো জোটকে কাজে লাগাচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে প্রতিহত করা। এর বিপরীতে, চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে অবকাঠামো খাতে বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পদচিহ্ন প্রসারিত করছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ ও তার মতো অনেক দেশ উভয় পরাশক্তির কাছ থেকে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহায়তা পাচ্ছে, যা তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণে বাধ্য করছে। উদাহরণস্বরূপ, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF)-এর মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন প্রস্তাব নিয়ে আসে, তখন চীনও তার নিজস্ব উন্নয়ন মডেল এবং বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে হাজির হয়। এই দ্বিমুখী টানাপোড়েন আঞ্চলিক সংস্থা যেমন সার্ক (SAARC) এবং বিমসটেক (BIMSTEC)-এর কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করছে, কারণ সদস্য দেশগুলো প্রায়শই কোনো একটি শক্তির প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। এর ফলে, এই সংস্থাগুলোর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক সংহতিকে দুর্বল করতে পারে।

বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের (UN Peacekeeping Operations) মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগে এর প্রতিফলন দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয়ই জাতিসংঘের প্রধান অর্থদাতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ায়, তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর অর্থায়ন, ম্যান্ডেট এবং জনবল মোতায়েনের ক্ষেত্রে এই দুই পরাশক্তির ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার দেখা যায়, যা মিশনগুলোর কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা প্রায়শই ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত থাকে, যা মানবিক সহায়তা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাদের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু বাণিজ্যিক ক্ষেত্রকে নয়, বরং বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে, কারণ উভয় দেশই তাদের অর্থনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক এজেন্ডা নির্ধারণে সচেষ্ট থাকে।

সূচক ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চীনা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) ১৪.৪ ১০.৪ ৭.২ ৬.০ ৩.১ ২.০
চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) বিতর্ক নিষ্পত্তি মামলা (বাদী/বিবাদী) ৬৯/৪৮ ৭০/৫২ ৭২/৫৫ ৭৫/৫৭ ৭৮/৬১ ৮০/৬৩
BIMSTEC সদস্য দেশগুলিতে চীনের সরাসরি বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) ৩.৫ ৪.১ ৪.৭ ৫.২ ৫.৯ ৬.৫
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে মার্কিন বাজেট অবদান (%) ২৭.৮৯ ২৭.৮৯ ২৭.৮৯ ২৮.৩০ ২৮.৬৯ ২৯.৪০
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে চীনা বাজেট অবদান (%) ১২.০৪ ১২.০৪ ১৫.২৫ ১৫.৩০ ১৫.৯৩ ১৬.৪০

উৎস: মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ, রোদিয়াম গ্রুপ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO), জাতিসংঘ বাজেট কমিটি (C5), সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিনিয়োগ বোর্ড।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি 'অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বৈচিত্র্যকরণ ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার প্রধান কাজ হবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক টানাপোড়েন পর্যবেক্ষণ করা এবং বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার, বিনিয়োগ উৎস ও প্রযুক্তি অংশীদারিত্বে নতুন সুযোগ অন্বেষণ করে একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কৌশল ২০২০-২৫' প্রণয়ন করা। এই কৌশলটি শুধুমাত্র উভয় পরাশক্তির উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করবে।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষত, 'BIMSTEC মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি' এবং 'SAARC ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড' সক্রিয় করে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য অন্তত ২৫% বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বাইরের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সম্মিলিত শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী হয়।
  • জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে স্থিতিশীল এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে (UN General Assembly) তার 'স্কেল অফ অ্যাসেসমেন্টস' (Scale of Assessments) পদ্ধতি পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর অবদান তাদের বর্তমান জিডিপি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির শেয়ারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এর মাধ্যমে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অবদান নিয়ে চলমান বিতর্ক নিরসন হবে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর কার্যকারিতা বজায় থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহান ফুয়াদ

ফারহান ফুয়াদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator