এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ডেটা-নির্ভর কৃষি বিপ্লব কতটা সুদূরপরাহত? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ডেটা-নির্ভর কৃষি বিপ্লব কতটা সুদূরপরাহত?

মাহমুদুল হাসান  avatar   
মাহমুদুল হাসান
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ডেটা-নির্ভর কৃষি বিপ্লব কতটা সুদূরপরাহত?
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ডেটা-নির্ভর কৃষি বিপ্লব কতটা সুদূরপরাহত?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) স্মার্ট কৃষি উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের ১৬টি জেলার ১২০টি উপজেলায় 'স্মার্ট কৃষি কার্ড' বিতরণের পাইলট প্রকল্প শুরু করেছ...

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) স্মার্ট কৃষি উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের ১৬টি জেলার ১২০টি উপজেলায় 'স্মার্ট কৃষি কার্ড' বিতরণের পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মাটির স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য, ফসলের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির পরামর্শ সরাসরি তাদের মোবাইল ফোনে পাচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের কৃষি খাতে ডেটা-নির্ভর বিপ্লবের একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ পদ্ধতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। তবে এই বিপ্লব কতটা সুদূরপরাহত, তা নির্ভর করছে এর বাস্তবায়ন, কৃষকদের গ্রহণ ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর।

বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) বহু বছর ধরে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তারা এগ্রি-টেক ও স্মার্ট ফার্মিং প্রযুক্তির দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। BARI-এর অধীনে স্থাপন করা হয়েছে 'স্মার্ট এগ্রিকালচার ল্যাব' যেখানে সেন্সর-ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা, ড্রোন ব্যবহার করে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ফসলের রোগ নির্ণয়ের মতো প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। BRRI-ও তাদের উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট সার ও সেচ ব্যবস্থাপনার পরামর্শ প্রদানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কাজ করছে, যা কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে এবং ফলন বাড়াতে সাহায্য করবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল মাঠপর্যায়ে DAE-এর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া একটি চ্যালেঞ্জ, কারণ প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা এখনো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি বড় বাধা। উদাহরণস্বরূপ, BRRI কর্তৃক উদ্ভাবিত কিছু সেন্সর-ভিত্তিক মাটি পরীক্ষা কিট রয়েছে যা দ্রুত মাটির পুষ্টি উপাদান বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু এর ব্যবহারবিধি এবং রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় ব্যাপক প্রচলন এখনো সম্ভব হয়নি।

কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগ্রি-টেক নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। BARC-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট আবাদি জমির মাত্র ৭-১০% স্মার্ট ফার্মিং প্রযুক্তির আওতায় এসেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো বাণিজ্যিক খামার। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা এখনো সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে স্মার্ট ফার্মিং প্রযুক্তির সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ, স্মার্ট ফার্মিং শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচলনেও সহায়ক। উদাহরণস্বরূপ, ড্রিপ ইরিগেশন বা সেন্সর-ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা পানির অপচয় রোধ করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি। তবে এই প্রযুক্তির প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় এবং এর পরিচালনা জ্ঞান কৃষকদের জন্য একটি বড় বাধা। সরকার এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিগুলোকে আরও সহজলভ্য করার কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রযুক্তি ক্ষেত্র ২০২০ সালে গ্রহণ হার (%) ২০২৩ সালে গ্রহণ হার (%) লক্ষ্য ২০৩০ (%)
সেন্সর-ভিত্তিক সেচ ২.৫ ৪.৮ ১৫
ড্রোন-ভিত্তিক ফসল পর্যবেক্ষণ ০.৮ ১.৭ ৮
স্মার্ট ফার্টিলাইজার/পেস্ট ম্যানেজমেন্ট ১.২ ২.৬ ১২
ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ সেবা ১০.০ ১৬.৫ ৩৫
ওয়েদার ফোরকাস্টিং সার্ভিসেস ৫.০ ৯.০ ২০

উৎস: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) ও DAE, ২০২৩ এর সম্মিলিত প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) যৌথভাবে 'স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' স্থাপন করবে, যেখানে প্রতি বছর অন্তত ১ লক্ষ কৃষককে সেন্সর-ভিত্তিক কৃষি, ড্রোন প্রযুক্তি ও ডেটা বিশ্লেষণের ওপর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই কেন্দ্রগুলো উপজেলা কৃষি অফিসের অধীনে পরিচালিত হবে এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জোর দেবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) ২০২৫ সালের মধ্যে 'জাতীয় কৃষি ডেটা হাব' প্রতিষ্ঠা করবে, যা BRRI, BARI এবং DAE থেকে প্রাপ্ত মাটির স্বাস্থ্য, আবহাওয়া, ফসলের ফলন এবং রোগবালাই সম্পর্কিত ডেটা একত্রিত করবে। এই হাবের ডেটা ব্যবহার করে কৃষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও ব্যক্তিগতকৃত কৃষি পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি উন্মুক্ত অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (API) তৈরি করা হবে, যা বেসরকারি এগ্রি-টেক সংস্থাগুলোকে উদ্ভাবনী সমাধান তৈরি করতে উৎসাহিত করবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় 'জলবায়ু সহনশীল স্মার্ট কৃষি নীতি ২০২৬' প্রণয়ন করবে, যেখানে স্মার্ট ফার্মিং প্রযুক্তির প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। এই নীতির আওতায়, সৌরশক্তি চালিত সেচ ব্যবস্থা এবং বায়োচার উৎপাদন প্রযুক্তির মতো পরিবেশবান্ধব স্মার্ট কৃষি সরঞ্জাম ক্রয়ে কমপক্ষে ৩০% সরকারি ভর্তুকি নিশ্চিত করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator