ফিক্সিং ও ডোপিং: স্পোর্টস ল'র ফাঁক গলে রেহাই পাওয়ার প্রবণতা ও করণীয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফিক্সিং ও ডোপিং: স্পোর্টস ল'র ফাঁক গলে রেহাই পাওয়ার প্রবণতা ও করণীয়

ব্যারিস্টার সামির  avatar   
ব্যারিস্টার সামির
ফিক্সিং ও ডোপিং: স্পোর্টস ল'র ফাঁক গলে রেহাই পাওয়ার প্রবণতা ও করণীয়
ফিক্সিং ও ডোপিং: স্পোর্টস ল'র ফাঁক গলে রেহাই পাওয়ার প্রবণতা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

২০২৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালীন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) কর্তৃক দুজন ক্রিকেটারকে ডোপিং-বিরোধী বিধি লঙ্ঘনের দায়ে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা, এব...

২০২৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালীন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) কর্তৃক দুজন ক্রিকেটারকে ডোপিং-বিরোধী বিধি লঙ্ঘনের দায়ে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা, এবং পরবর্তীতে তাদের আপিলের প্রেক্ষিতে শাস্তির মেয়াদ হ্রাসের ঘটনাটি আবারও ক্রীড়া জগতে ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন ও তার প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দৃষ্টান্ত নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে ক্রমবর্ধমান একটি প্রবণতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্রীড়াবিদ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রায়শই জটিল ক্রীড়া আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে গুরুতর অপরাধের দায় থেকে আংশিক বা সম্পূর্ণ রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, যেখানে জাতীয় ক্রীড়া আইন ও বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে দুর্বল বা অস্পষ্ট থাকে, সেখানে এই প্রবণতা আরও প্রকট। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্রীড়া আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের দুর্বলতা, এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয়ের অভাব প্রায়শই এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে অপরাধীরা যথাযথ শাস্তির মুখোমুখি হয় না, যা খেলাধুলার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

ক্রীড়াঙ্গনে ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের মতো অপরাধগুলো কেবল খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সততাকেই নয়, বরং পুরো খেলার বিশ্বাসযোগ্যতা ও দর্শকদের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। ফিক্সিংয়ের ক্ষেত্রে, অর্থ বা অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে ম্যাচের ফলাফল প্রভাবিত করা হয়, যা প্রায়শই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সাথে জড়িত থাকে। অন্যদিকে, ডোপিং হলো পারফরম্যান্স-বর্ধক ড্রাগ সেবন করে অন্যায্য সুবিধা অর্জন করা, যা খেলার সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। আন্তর্জাতিক ডোপিং-বিরোধী সংস্থা (WADA) এবং বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের কঠোর বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নতুন নতুন ডোপিং পদ্ধতির উদ্ভাবন হচ্ছে, যা সনাক্তকরণকে আরও কঠিন করে তুলছে। অনেক সময়, নির্দিষ্ট ড্রাগের সনাক্তকরণ পদ্ধতি পুরনো হয়ে যাওয়ার পর নতুন কোনো ড্রাগ বাজারে আসে, এবং সেই ড্রাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে এবং তার সনাক্তকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবিত হতে বেশ সময় লেগে যায়। এই সময়টুকুই অনেক অসাধু খেলোয়াড়কে ডোপিংয়ের সুযোগ করে দেয়। এছাড়া, বিভিন্ন দেশের জাতীয় ক্রীড়া আইন ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও অপরাধীদের জন্য এক ধরনের সুরক্ষা বলয় তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি দেশের জাতীয় আইনে ডোপিংয়ের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও, আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের আইনে যদি আপিলের সুযোগ বা শাস্তির মেয়াদ কমানোর সুযোগ থাকে, তবে অভিযুক্তরা সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার ক্রীড়া আইন প্রণয়নে যে ধীরগতি দেখাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শক্তিশালী আইন কাঠামো গঠনে বড় বাধা সৃষ্টি করছে, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আরও বেশি অরক্ষিত করে তুলছে।

এই সমস্যাটি কেবল আইন প্রণয়নের দুর্বলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার অভাবও একটি বড় কারণ। ফিক্সিংয়ের তদন্তে প্রায়শই আর্থিক লেনদেনের জটিল জাল উন্মোচন করতে হয়, যা ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং এবং সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন। কিন্তু অনেক দেশের ক্রীড়া সংস্থাগুলোতে এই ধরনের বিশেষায়িত দক্ষতার অভাব রয়েছে। ডোপিংয়ের ক্ষেত্রে, অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি এবং প্রশিক্ষিত বিজ্ঞানীর প্রয়োজন, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য ব্যয়বহুল। World Bank এবং ADB-এর মতো সংস্থাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করলেও, ডোপিং-বিরোধী ল্যাবরেটরি স্থাপন বা ফিক্সিং তদন্তে বিশেষায়িত দল গঠনের মতো নির্দিষ্ট খাতে তাদের সহায়তা অপ্রতুল। ফলে, অনেক দেশেই ডোপিং পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বা ফিক্সিংয়ের তদন্ত মুখ থুবড়ে পড়ে। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই অনেক অসাধু ক্রীড়াবিদ ও চক্র পার পেয়ে যায়। যখন কোনো খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে আপিল করে, তখন তাদের পক্ষে প্রায়শই ব্যয়বহুল আইনজীবী থাকেন, যারা আইনের সূক্ষ্ম ফাঁকফোকরগুলো খুঁজে বের করতে পারদর্শী। অপরপক্ষে, জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর আইনি সহায়তা প্রায়শই দুর্বল হয়, যা তাদের মামলা জিততে বাধা দেয়। এই অসামঞ্জস্যতা ক্রীড়া আইনের প্রয়োগকে আরও জটিল করে তোলে এবং ন্যায়বিচারের পথকে রুদ্ধ করে।

প্রতিষ্ঠান/সংস্থা মোট ডোপিং-বিরোধী বিধি লঙ্ঘন (২০২০-২০২২) শাস্তিপ্রাপ্তির হার (%) আপিল করে শাস্তি হ্রাসের হার (%) উল্লেখযোগ্য ফাইন্যান্সিয়াল ফিক্সিং অভিযোগ (২০২০-২০২২)
WADA ৪,২৬৫ ৬৭% ১২% -
ICC ৩৪ ৭১% ১৮% ১৩
FIFA ১১২ ৬২% ১০% ৭
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) ৭ ৪৩% ২৮% ২
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (BFF) ৩ ৩৩% ৩৩% ১

উৎস: World Anti-Doping Agency (WADA) Annual Reports, International Cricket Council (ICC) Integrity Unit Reports, FIFA Disciplinary Committee Reports, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত ক্রীড়া পরিসংখ্যান।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র 'জাতীয় ক্রীড়া অপরাধ তদন্ত ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত শাখা হিসেবে কাজ করবে এবং আর্থিক লেনদেন ও সাইবার ফরেনসিকের উপর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবে। এই ইউনিটটি শুধুমাত্র ফিক্সিং, ডোপিং এবং অন্যান্য ক্রীড়া অপরাধের তদন্ত করবে, এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ICC'র দুর্নীতি দমন ইউনিটের সাথে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে, যা বর্তমানে বিদ্যমান 'জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন, ১৯৭৪' এর দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে।
  • World Bank ও ADB-এর সাথে সমন্বয় করে বাংলাদেশের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে একটি অত্যাধুনিক ডোপিং-বিরোধী ল্যাবরেটরি স্থাপন ও পরিচালনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প হাতে নিতে হবে। এই প্রকল্পটিতে WADA-এর মানদণ্ড অনুযায়ী ল্যাবরেটরি স্থাপন, প্রশিক্ষিত বিজ্ঞানী নিয়োগ এবং নিয়মিত প্রযুক্তিগত আপগ্রেডের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিত করতে হবে, যা বর্তমানে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি, ২০১৫'-তে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি।
  • বাংলাদেশের বিদ্যমান 'খেলাধুলা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ আইন' (যদি থাকে, বা প্রস্তাবিত আইন) সংশোধন করে ডোপিং ও ফিক্সিংয়ের জন্য ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে, এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আপিল প্রক্রিয়া ও সালিশি বোর্ড গঠনের ধারা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে করে, অপরাধীরা জাতীয় আইনের ফাঁক গলে বের হতে পারবে না এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল আইনি লড়াইয়ের প্রবণতা হ্রাস পাবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার সামির

ব্যারিস্টার সামির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফিক্সিং, ডোপিং ও স্পোর্টস ল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator