এগ্রি-টেক ও স্মার্ট ফার্মিং: ডেটা বিপ্লবে পিছিয়ে কেন আমাদের কৃষক? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এগ্রি-টেক ও স্মার্ট ফার্মিং: ডেটা বিপ্লবে পিছিয়ে কেন আমাদের কৃষক?

মাহমুদুল হাসান  avatar   
মাহমুদুল হাসান
এগ্রি-টেক ও স্মার্ট ফার্মিং: ডেটা বিপ্লবে পিছিয়ে কেন আমাদের কৃষক?
এগ্রি-টেক ও স্মার্ট ফার্মিং: ডেটা বিপ্লবে পিছিয়ে কেন আমাদের কৃষক?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট কৃষকের মাত্র ৭-৮% বর্তমানে কোনো না কোনো ডিজিটাল কৃষি প্রযুক্তির (এগ্রি-টে...

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট কৃষকের মাত্র ৭-৮% বর্তমানে কোনো না কোনো ডিজিটাল কৃষি প্রযুক্তির (এগ্রি-টেক) ব্যবহার করছেন। এই পরিসংখ্যানটি স্মার্ট ফার্মিংয়ের বৈশ্বিক অগ্রগতির বিপরীতে আমাদের কৃষিখাতের একটি স্পষ্ট ব্যবধান নির্দেশ করে, যেখানে উপাত্ত-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া কৃষিকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। অথচ, বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বহু বছর ধরে উন্নত বীজ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং সীমিত আকারে কিছু প্রযুক্তির গবেষণা ও প্রচারে নিয়োজিত থাকলেও, মাঠ পর্যায়ে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এখনও অধরা।

এই বিশাল ব্যবধানের মূল কারণগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডিজিটাল বিভাজন (digital divide) এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাবই প্রধান অন্তরায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রাপ্যতা, স্মার্টফোন ব্যবহারের নিম্নহার এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্মার্ট ফার্মিংয়ের প্রয়োজনীয় ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। কৃষকদের একটি বড় অংশ এখনও প্রথাগত চাষাবাদ পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা সম্পর্কে অবগত নন। এমনকি, কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তি সম্পর্কে ভুল ধারণা বা প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়ও তাদের এগ্রি-টেকের দিকে আকৃষ্ট হতে বাধা দিচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর সমন্বিত গবেষণা কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও, এই গবেষণা ল্যাব থেকে মাঠ পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা রয়েছে, যা নতুন প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারে বাধা সৃষ্টি করছে।

এগ্রি-টেক ও স্মার্ট ফার্মিং কেবল ফলন বৃদ্ধি বা শ্রম কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন-ভিত্তিক নজরদারি এবং মাটির আর্দ্রতা সেন্সর ব্যবহার করে ফসলের রোগবালাই শনাক্তকরণ, সেচের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ এবং সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমে, তেমনি রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহার হ্রাস পেয়ে মাটি ও পানির দূষণ কমে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত টেকসই কৃষি নীতিমালার সাথে স্মার্ট ফার্মিংয়ের এই দিকটি অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ, কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। জলবায়ু স্মার্ট কৃষি (Climate-Smart Agriculture) ধারণাটি আমাদের কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে DAE ও BARI-এর যৌথ উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন, যেখানে উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে শস্য বৈচিত্র্য এবং জলবায়ু সহনশীল জাতের চাষাবাদকে উৎসাহিত করা হবে।

সূচক ২০১৫ সাল ২০২০ সাল ২০২৩ সাল (আনুমানিক)
কৃষকদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার (%) ১২% ৩০% ৪২%
কৃষকদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার (%) ৫% ১৮% ৩২%
কৃষি সম্প্রসারণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার (%) ২% ৬% ৮%
প্রতি ১০০০ কৃষক প্রতি কৃষি সেবায় নিযুক্ত টেকনিশিয়ান ০.৮ ১.১ ১.৩

উৎস: DAE বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২১-২২), BARI ও BRRI গবেষণা সারসংক্ষেপ, এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)

সুপারিশ

  • জাতীয় ডিজিটাল কৃষি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: সরকার কর্তৃক একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় ডিজিটাল কৃষি নীতিমালা' প্রণয়ন করা উচিত, যা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে গ্রামীণ এলাকায় উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণ, কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী স্মার্টফোন ও ডেটা প্যাক নিশ্চিত করবে। এই নীতিমালায় DAE-এর মাধ্যমে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।
  • কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষকদের মধ্যে প্রযুক্তিগত সেতুবন্ধন: BARC, BARI এবং BRRI-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের উদ্ভাবিত স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তিগুলো (যেমন – IoT সেন্সর, ড্রোন-ভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ, AI-নির্ভর ফসলের পূর্বাভাস) DAE-এর সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী 'প্রযুক্তি হস্তান্তর ও প্রদর্শন কেন্দ্র' স্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে, প্রতিটি উপজেলা কৃষি অফিসে একটি করে 'স্মার্ট ফার্মিং প্রদর্শনী প্লট' স্থাপন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
  • পরিবেশ-বান্ধব স্মার্ট ফার্মিংয়ে প্রণোদনা ও অর্থায়ন: পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি 'সবুজ কৃষি তহবিল' গঠন করা উচিত, যা পরিবেশ-বান্ধব স্মার্ট ফার্মিং প্রযুক্তি (যেমন – নির্ভুল সেচ ব্যবস্থা, সৌরশক্তি চালিত কৃষি যন্ত্রপাতি, বায়ো-ইনপুট ডেটা ট্র্যাকিং) গ্রহণে কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ভর্তুকি এবং কর মওকুফের সুবিধা প্রদান করবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এই তহবিলের আওতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিতে হবে যাতে তারা কৃষকদের জন্য বিশেষ 'এগ্রি-টেক ঋণ প্যাকেজ' চালু করে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator