এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: 'ডিজিটাল ডিভাইড' কি কৃষকের মূলধন গিলে খাচ্ছে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: 'ডিজিটাল ডিভাইড' কি কৃষকের মূলধন গিলে খাচ্ছে?

মাহমুদুল হাসান  avatar   
মাহমুদুল হাসান
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: 'ডিজিটাল ডিভাইড' কি কৃষকের মূলধন গিলে খাচ্ছে?
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: 'ডিজিটাল ডিভাইড' কি কৃষকের মূলধন গিলে খাচ্ছে?
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: মাহমুদুল হাসান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: মাহমুদুল হাসান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং)

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে কৃষি খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের হার প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে এর সুফল প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষ করে, স্মার্ট কৃষি যন্ত্রপাতি এবং আইওটি (Internet of Things) ভিত্তিক সেন্সর ব্যবহারের সুবিধা মূলত বৃহৎ ও মাঝারি আকারের কৃষি খামারগুলিতে সীমাবদ্ধ থাকছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও ইন্টারনেট সংযোগের অভাব, ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি এবং উচ্চমূল্যের প্রযুক্তির কারণে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির আওতার বাইরে। এই 'ডিজিটাল ডিভাইড' বা ডিজিটাল বিভাজন একদিকে যেমন কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বাধা দিচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে তাদের মূলধনকে পরোক্ষভাবে ক্ষয় করছে, কারণ তারা প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।

এগ্রি-টেক এবং স্মার্ট ফার্মিংয়ের ধারণা কৃষকদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও, এর প্রয়োগ ক্ষেত্রটি এখনও অসম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) যৌথভাবে উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ, সুনির্দিষ্ট সার প্রয়োগ পদ্ধতি এবং রোগবালাই দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ড্রোন-ভিত্তিক স্প্রেয়িং প্রযুক্তি বা স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বৃহৎ খামারগুলিতে কীটনাশক ও সারের ব্যবহার কমিয়ে খরচ বাঁচাতে সাহায্য করছে। তবে, এই প্রযুক্তিগুলির প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক বেশি, যা ক্ষুদ্র কৃষকদের সামর্থ্যের বাইরে। ফলস্বরূপ, ক্ষুদ্র কৃষকরা পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, যেখানে উৎপাদন খরচ বেশি এবং ফলন কম। এটি তাদের মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং তাদের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ২০২২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারকারী কৃষকদের গড় নিট আয় ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ব্যবহারকারীদের চেয়ে প্রায় ২০-২৫% বেশি, যা ডিজিটাল বিভাজনের অর্থনৈতিক প্রভাবকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ডিজিটাল বিভাজন শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকেই নয়, তথ্য ও জ্ঞান প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) বিভিন্ন গবেষণা ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করলেও, ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক কৃষকই এই তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির তথ্য অনলাইনে সহজলভ্য হলেও, গ্রাম পর্যায়ে এর প্রচার ও প্রসারে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। কৃষকবান্ধব অ্যাপ্লিকেশন (যেমন: কৃষি বাতায়ন) তৈরি হলেও, অধিকাংশ কৃষক এর ব্যবহারবিধি সম্পর্কে অবগত নন অথবা প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবে এর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা নিতে পারছেন না। এই তথ্যগত বিভাজন কৃষকদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিচ্ছে, যা ফসলের গুণগত মান ও পরিমাণ উভয়কেই প্রভাবিত করছে এবং পরোক্ষভাবে তাদের মূলধনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সূচক ২০২০ ২০২২ ২০২৪ (প্রক্ষেপিত)
কৃষি খাতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী কৃষক (%) ২২% ৩৭% ৫০%
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কৃষক (%) ১৫% ২৮% ৪০%
ডিজিটাল কৃষি অ্যাপ ব্যবহারকারী কৃষক (%) ৫% ১২% ২৫%
আইওটি/সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহারকারী খামার (%) ১.৫% ৩.২% ৬%
প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা (%) ১০% ১৮% ৩০%

উৎস: DAE, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ যৌথভাবে 'কৃষি ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রোগ্রাম' চালু করবে, যার মাধ্যমে প্রতি উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর তত্ত্বাবধানে বিনামূল্যে কম্পিউটার ও স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে এবং কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করা হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি ঋণ নীতিমালায় পরিবর্তন এনে স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ক্রয়ের জন্য বিশেষ সাবসিডিযুক্ত ঋণ প্রকল্প চালু করবে, যেখানে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা থাকবে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সঙ্গে এই ঋণের সংযোগ স্থাপন করা হবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণ নীতিমালা' প্রণয়ন করবে, যা পরিবেশবান্ধব এগ্রি-টেক সমাধানগুলোর জন্য প্রণোদনা দেবে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কর্তৃক উদ্ভাবিত জলবায়ু সহনশীল জাত ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator