বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পর গঠিত নতুন বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পথচলা মোটেও মসৃণ নয়। সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি তাঁর সাম্প্রতিক এক আলোচনায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে এক অন্ধকার ও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে চীন ও আমেরিকার অনীহা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়হীনতা নতুন সরকারকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
১. পূর্ব ও পশ্চিমের সংকট: চীন এবং আমেরিকার অবস্থান
গোলাম মাওলা রনি জানান, বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তর-দক্ষিণ বলতে কিছু নেই, এখানে রয়েছে পূর্ব (চীন) এবং পশ্চিম (আমেরিকা)। বর্তমানে তারেক রহমানের জন্য এই দুই কুলই অন্ধকার।
-
চীনের অবস্থান: ইসরায়েলি বা মার্কিন প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার যে কৌশলগত সম্পর্ক বা চুক্তি বলবত রয়েছে, তা বহাল থাকা পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে কোনো প্রকার ‘বাজেট সাপোর্ট’ বা আনলিমিটেড তহবিল দেবে না। অথচ এই মুহূর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন।
-
আমেরিকার অবস্থান: আমেরিকার ইতিহাস পর্যালোচনা করে রনি বলেন, মার্কিন প্রশাসনকে পৃথিবীতে কেউ কখনো সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বাংলাদেশের কাছ থেকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে যা যা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা ইতিমধ্যে তারা আদায় করে নিয়েছে। এখন তারা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বা কৌশলগতভাবে বড় কোনো সুবিধা দেবে না, বরং নিজেদের কলোনিয়াল বা আধিপত্যবাদী স্বার্থে দেশের দুর্বল পরিস্থিতিকে ব্যবহার করবে।
২. অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও আস্থার সংকট
নতুন সরকারের বড় দুর্বলতা হলো এর ভেতরের বিভিন্ন শক্তির মেলবন্ধন। এই সরকারে জামায়াত, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, ভারতের সমর্থক এবং আমেরিকার সমর্থক—সব পক্ষেরই এক ধরণের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি রয়েছে, যার ফলে তারেক রহমান কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস বা নির্ভর করতে পারছেন না।
-
স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদের ব্যক্তিদের নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে নানা বিতর্ক চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে প্রতিপক্ষরা নানা আপত্তিকর কথা বললেও দলের পক্ষ থেকে তার কোনো সদুত্তর দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কূটনৈতিক পরিপক্বতা নিয়ে রনি তীব্র সমালোচনা করেছেন। অতীত আমলের রিয়াজ রহমান বা শমশের মবিন চৌধুরীর মতো ঝানু কূটনীতিকদের অভাব এখন তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।
-
পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়: পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা জুনায়েদ সাকির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রনি বলেন, রাজপথে হাত উঁচিয়ে কথা বলা আর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় চালানো এক জিনিস নয়। এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তদের পক্ষে সেখানে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ফলাফল আনা দূরহ হবে।
-
বাংলাদেশ ব্যাংক: বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদটি অর্থমন্ত্রীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ পদে যিনি এসেছেন, তাঁর সাথে বিএনপির বা তারেক রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনের কী সম্পর্ক, তা অস্পষ্ট।
৩. রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বনাম বর্তমান বাস্তবতা
গোলাম মাওলা রনি তাঁর নিজের সংসদীয় জীবনের অভিজ্ঞতা (২০০৮-২০১৪) টেনে বলেন, রাষ্ট্র কীভাবে চলে, সরকারের সংসদীয় কমিটিগুলো কীভাবে কাজ করে এবং ডিজিএফআই, র, সিআইএ-র মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কীভাবে ছায়া খাটিয়ে নীতি নির্ধারণ করে—তা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি না থাকলে বোঝা সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে, যার কারণে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন।
গোলাম মাওলা রনির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তারেক রহমান এবং বর্তমান সরকার যদি দ্রুত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য আনতে না পারে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় শক্ত অবস্থান নিতে না পারে, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে। চীন থেকে আর্থিক সহায়তা না পাওয়া এবং আমেরিকার কৌশলগত চাপের মুখে পড়ে বাংলাদেশকে এক বড় ধরণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।