জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত 'জুলাই সনদ'-এ স্বাক্ষর করেও বিপাকে পড়েছে বিএনপি। জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন এবং গণভোট আয়োজনের যে রূপরেখা ঘোষণা করেছে, বিএনপি এখন তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যেখানে সনদে স্বাক্ষর না করেও এনসিপি (NCP) এবং জামায়াত খুশি, সেখানে গণভোটের বিষয়টি জোরালো হওয়ায় বিএনপি খানিকটা অস্বস্তিতে পড়েছে।
অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে আমূল সংস্কারের দাবিতে 'জুলাই সনদ' প্রণীত হয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সরকার যখন জুলাই সনদে স্বাক্ষর নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে, তখন এনসিপি এর আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু বিএনপি সহ অন্যান্য দল সনদটিতে স্বাক্ষর করেছিল। তবে ২৮ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন যখন সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে গণভোটের প্রস্তাব দেয়, তখন সেই গণভোটের বিষয়টা জোরালো হওয়ায় বিএনপি অস্বস্তিতে পড়ে যায়। এই গণভোটের প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্বাচিত সরকার গঠনের আগেই জনগণের রায়ে নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক কৌশল ও নাটকীয় পরিবর্তন:
জুলাই সনদের প্রস্তাবে এনসিপি শুরু থেকেই গণভোট বা গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধন নির্বাচিত সরকার আসার আগেই করার দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু বিএনপি সংবিধান পরিবর্তনের ব্যাপারে হাত দিতে নারাজ ছিল, তাদের কথা ছিল সংস্কার বাস্তবায়নের অধিকার নির্বাচিত সরকারের। ঐক্যমত্য কমিশন যখন সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর নেওয়া শুরু করে, তখন সেখানে গণভোটের কোনো উল্লেখ ছিল না, বরং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ কারণেই বিএনপি সনদটিতে স্বাক্ষর করে। তবে এনসিপি সেই সময় স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। নাটকীয়ভাবে, ২৮ অক্টোবর ঐক্যমত্য কমিশন জুলাই সনদের সাংবিধানিক ভিত্তি নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের রূপরেখা ঘোষণা করে, যা এনসিপি-এর দাবি পূরণ করে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সনদে স্বাক্ষর আদায়ের জন্য প্রথমে গণভোটের বিষয়টি গোপন রাখা হয় এবং পরে বিএনপিকে কোণঠাসা করার জন্য এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির অস্বস্তির কারণ: বিএনপির মূল সমস্যা হলো, সনদের কিছু বিষয় নিয়ে তাদের আপত্তি বা ভিন্নমত রয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় চলে এলে সেই সংস্কারগুলো সংবিধানে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যাবে, যা পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার চাইলেও সহজে পরিবর্তন করতে পারবে না। যদি গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট জিতে যায়, তবে বিএনপি তার পছন্দসই পরিবর্তন আনার সুযোগ হারাবে। অন্যদিকে, তাদের বক্তব্য হলো—গণভোটে জনগণের রায় চলে এলে সেটা অটোমেটিক সংবিধানে চলে যাবে, কিন্তু সকল বিষয়ে তো বিএনপি একমত নয়।
গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব: ঐক্যমত্য কমিশনের সনদে মোট ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত। এর মধ্যে প্রধান প্রস্তাবগুলো হলো:
-
তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সরাতে চাইলে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত লাগবে, যাতে কেউ সহজে এই ব্যবস্থা বাতিল করতে না পারে।
-
আইনসভা: রাষ্ট্রের আইনসভাকে দুই কক্ষ বিশিষ্ট (নিম্নকক্ষ আসনভিত্তিক, উচ্চকক্ষ ভোটের সংখ্যানুপাতিক) করার সুপারিশ করা হয়েছে।
-
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা: একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ বছর করার এবং একই ব্যক্তি দলীয় ও সরকার প্রধান হতে না পারার প্রস্তাব রয়েছে।
-
৭০ ধারার সংশোধন: অর্থবিল এবং আস্থা বিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিল বা প্রস্তাবের বিপক্ষে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন, ফলে ৭০ ধারায় সংস্কার আনা হয়েছে।
ঐক্যমত্য কমিশনের প্রস্তাব হলো, সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরবর্তী সরকার আসার আগেই জনগণের সম্মতি নিয়ে সংবিধানে যুক্ত করা।