জুলাই বিপ্লবের পরও সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন ইউডিসি, সিএনএস, রেগনামসহ একাধিক কোম্পানির মাধ্যমে সড়ক-সেতুর টোল আদায় অব্যাহত আছে। সম্প্রতি দুদকের মামলায় শেখ হাসিনা-সহ ১৭ জন অভিযুক্ত হয়েছেন।
দেশের সড়ক ও সেতুর টোল আদায়কে কেন্দ্র করে সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের গড়ে তোলা লুটপাটের সাম্রাজ্য জুলাই বিপ্লবের পরও প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অব্যাহত আছে। সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানসহ নেতাদের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো আধুনিক টোল ব্যবস্থাপনার নামে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব লুটে নিয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে।
আওয়ামী শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছর ধরে লুটের এই সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়। সাবেক মন্ত্রীদের কোম্পানি ইউডিসি কনস্ট্রাকশন, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস), শামীম এন্টারপ্রাইজ, সেল ভান, রেগনাম, এটিটি এবং পেন্টা গ্লোবালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে। এই কোম্পানিগুলো ভারতীয় পার্টনার ভ্যান ইনফ্রার সহযোগিতায় টোল কালেকশন করে ৫০ শতাংশ জমা দিত আর ৫০ শতাংশ লুটপাট করত, ফলে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে এত ক্ষমতা ছিল যে, তাদের বিষয়গুলো সঠিকভাবে অডিটও করা হতো না।
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কোম্পানি সিএনএস দলীয় প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার ছাড়াই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে ২৪ শতাংশ রেশিওতে যমুনা সেতুর টোল আদায় করে। এটি গত এক যুগে বিআরটিএর অন্তত পাঁচটি কাজ বাগিয়ে নেয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ভৈরব, ঘোড়াশাল ও লেবুখালী সেতুর টোল নিয়ন্ত্রণ করছে। একই ভাবে মির্জা আজমের নিয়ন্ত্রণাধীন ইউডিসি কনস্ট্রাকশন বর্তমানে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং একটানা ১৭ বছর রূপসা সেতু, লালন শাহ সেতুসহ অন্যান্য সেতুর টোল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শামীমের শামীম এন্টারপ্রাইজও এই টোল সাম্রাজ্যের দৃশ্যপটে রয়েছে।
সম্প্রতি মেঘনা-গোমতী সেতুতে টোল আদায়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিএনএসের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক ছয় মন্ত্রী ও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। দুদকের অভিযোগ, একক উৎসভিত্তিক দরপত্রের মাধ্যমে সিএনএসকে টোল আদায়ের দায়িত্ব দেওয়ায় সরকারের ৩০৯ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
জানা যায়, সাবেক যোগাযোগ সচিব নজরুল ইসলাম বড় ধরনের অনিয়ম দেখে টেন্ডার বাতিল করে দিলেও তিনি অবসরে যাওয়ার পর নতুন সচিব নুরিকে ম্যানেজ করে বাতিল টেন্ডার পুনরায় রিভিউ ও পাস করিয়ে নেয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। টিআইবি'র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, আমলাদের জোরালো যোগসাজশ ছাড়া রাজনীতিকদের পক্ষে এতটা দুর্নীতি করা সম্ভব ছিল না, তাই আমলাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় টেন্ডার এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
আশ্চর্যজনকভাবে, জুলাই বিপ্লবের পরও আওয়ামী নেতাদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো অদৃশ্য শক্তির ইশারায় বর্তমান প্রশাসনকে অবৈধ সুবিধা দিয়ে এসব টোলপ্লাজায় বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।