পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে ভালো চাকরির আশায় রাশিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য নজরুল ইসলাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকে বাধ্য করা হয় ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করতে। প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁর নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে পরিবার; এখন দেশে ফিরছে তাঁর নিথর দেহ।
চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি দালাল ফরিদ হোসেনের মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নজরুল ইসলাম রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। দালাল তাঁকে ভালো বেতনের চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। রাজবাড়ীর কোলারহাটের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন ক্রীড়াপ্রেমী ও ভালো মানুষ, যিনি কেবল স্ত্রী ও চার কন্যার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন।
সেখানে পৌঁছানোর পর চাকরির বদলে তাঁকে বাধ্য করা হয় সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে। এরপর তাঁকে ঠেলে দেওয়া হয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ভয়াবহ রণাঙ্গনে। প্রলোভন ও চুক্তির বিপরীতে গিয়ে একজন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীকে যুদ্ধে পাঠানো হয়, যা এই দালাল চক্রের আন্তর্জাতিক মানব পাচারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
গত ৩০শে এপ্রিল তিনি তাঁর স্ত্রী আইরিন আক্তারের সঙ্গে শেষবার কথা বলেন। সেই কথোপকথনে নজরুল ইসলাম তাঁর আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি স্ত্রীকে জানান, "আমি মনে হয় আর বাঁচবো না আর যুদ্ধে গেলে হয়তো আমি সম্ভবত মারা যাব... আল্লাহর কাছে তোমাদের রেখে গেলাম আরো চারটা মেয়েরে তোমারে দিয়ে গেলাম।" এটি ছিল যুদ্ধে যাওয়ার আগে এক পিতার চরম অসহায়ত্ব ও আকুতি।
৩০শে এপ্রিলের পর থেকে নজরুল ইসলাম নিখোঁজ ছিলেন। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস ধরে পরিবারটি আশা-নিরাশার দোলাচলে দিন কাটায়। অবশেষে বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর নিহতের দুঃসংবাদটি জানানো হয়, যা পরিবারের শেষ আশাটুকুও কেড়ে নেয়।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাঁর স্ত্রী আইরিন আক্তার আজ দিশেহারা। চার কন্যা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন গভীর সংকটে। তাঁদের বড় মেয়ে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন, দ্বিতীয় মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী এবং ছোট দুই মেয়ের বয়স যথাক্রমে ছয় ও পাঁচ বছর।
নিহতের পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী এই দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠিনতম শাস্তির দাবি জানিয়েছে। নিহতের ভাইয়ের অভিযোগ, দালাল তাঁকে চাকরির পরিবর্তে যুদ্ধে পাঠিয়ে হত্যা করেছে। স্থানীয়রা সবাই মিলে এই দালাল চক্রের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের জন্য সরকারের কাছে জোর আবেদন জানিয়েছেন।
নজরুলের মতো একজন সাবেক সেনা সদস্যের এমন করুণ পরিণতি সমাজে একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক নির্দেশ করে। ভালো বেতনের মিথ্যা প্রলোভনে ফেলে বিদেশে যুদ্ধের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষ পাঠানো—এই দালাল চক্রের কার্যক্রম দেশ থেকে মানব পাচারের আন্তর্জাতিক রুটগুলির ওপর আলোকপাত করে, যেখানে দারিদ্র্য ও ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষা মূল পুঁজি।
এই গুরুতর ঘটনা প্রসঙ্গে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতান আক্তার জানান, এ সংক্রান্ত কোনো চিঠি এখনও তাঁর দপ্তরে এসে পৌঁছায়নি। তবে তিনি আশ্বাস দেন যে চিঠি পেলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনিক স্তরে এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ ও নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।
নিহতের স্ত্রী ও স্বজনরা সরকারের কাছে দ্রুত নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দালাল ফরিদ হোসেন ও তাঁর চক্রের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং দালাল চক্রের মাধ্যমে মানব পাচারের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের একটি পরীক্ষা।