ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গাজা যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে রাজি হয়েছে ইসরায়েল ও হামাস। বন্দি মুক্তি, সেনা প্রত্যাহার ও স্থায়ী শান্তির প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বজুড়ে আশা—কিন্তু কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?
গাজায় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে একমত হয়েছে ইসরায়েল ও হামাস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাতে ঘোষণা দেন, তার প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করলেও, এর পেছনে রয়েছে জটিল কূটনৈতিক সমীকরণ।
গাজা যুদ্ধ ইতোমধ্যে ছয় লাখেরও বেশি মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে—৬৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং হাজারো আহত। জাতিসংঘের একটি কমিশন এই যুদ্ধকে ‘গণহত্যা-সদৃশ অপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে স্বস্তির সঞ্চার করেছে।
বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, ‘‘সব জিম্মিকে খুব শিগগিরই মুক্তি দেওয়া হবে এবং ইসরায়েল তাদের সৈন্যদের নির্ধারিত সীমারেখায় ফিরিয়ে নেবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘এটি স্থায়ী শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ।’’
কাতার, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ‘‘আমরা খুব কাছাকাছি এক স্থায়ী সমাধানের।’’
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর হোয়াইট হাউসের ভেতরে কূটনৈতিক নড়াচড়া বেড়ে যায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্পের হাতে একটি বিশেষ চিঠি তুলে দেন, যেখানে লেখা ছিল, ‘‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক এক চুক্তির খুব কাছাকাছি।’’
এই চিঠির পরই ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট দেন, যেখানে তিনি বলেন—ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই প্রথম ধাপে রাজি হয়েছে, সব বন্দি মুক্তি পাবে, সৈন্য প্রত্যাহার হবে এবং এটি স্থায়ী শান্তির রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। আল-জাজিরার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেছেন, ‘‘যুদ্ধ শেষ করার প্রাথমিক অংশটি কার্যকর হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ইসরায়েলের সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা, হামাসের ভবিষ্যৎ এবং গাজার প্রশাসনিক কাঠামো—সবই এখনো অনিশ্চিত।’’
হামাস জানিয়েছে, ইসরায়েলি সরকারের অনুমোদনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই জীবিত জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে। ট্রাম্প ফক্স নিউজে বলেন, ‘‘সোমবারের মধ্যেই বন্দিদের ফিরিয়ে আনা হবে। এমনকি মৃতদেহও ফেরত দেওয়া হবে।’’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ‘‘মহান দিন’’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘‘আমাদের জিম্মিদের মুক্তির এই পবিত্র মিশনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’’
অন্যদিকে হামাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘এই চুক্তি গাজার দখলদার বাহিনী প্রত্যাহার, ত্রাণ প্রবেশ ও বন্দি বিনিময়ের নতুন পথ খুলে দিয়েছে।’’
গাজার বাসিন্দারা এই খবরে একদিকে উল্লসিত, অন্যদিকে সতর্ক। দুই বছরের ধ্বংসযজ্ঞে বিপর্যস্ত এই অঞ্চল যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় আশার আলো দেখলেও অনেকেই এখনও ভয় ও অবিশ্বাসের মধ্যে আছেন। এক ফিলিস্তিনি বাসিন্দা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘‘আমরা শান্তি চাই, কিন্তু এর বিনিময়ে স্বাধীনতাকে হারাতে চাই না।’’
বিশ্বনেতারা এই চুক্তিকে প্রশংসা করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘‘এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এক অগ্রগতি।’’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘‘এই চুক্তি মানবিক সহায়তা ও বন্দি মুক্তির মাধ্যমে স্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত করবে।’’
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মন্তব্য করেছেন, ‘‘চুক্তিটি যেন কোনো বিলম্ব ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন মূল লক্ষ্য।’’
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা প্রশাসন তদারকির জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘‘বোর্ড অব পিস’’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন ট্রাম্প নিজে, আর সদস্য হিসেবে থাকবেন বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী নেতা, যার মধ্যে রয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও।
আগামী সপ্তাহে ট্রাম্প মিসর সফরে যাচ্ছেন বলে হোয়াইট হাউস সূত্র জানিয়েছে। সেখানে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা করবেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফর সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা এবার বাস্তবে রূপ নিতে পারে। তবে অনেকে মনে করছেন, এটি ট্রাম্পের নির্বাচনী কৌশলেরও অংশ—কারণ তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনের প্রচারণায় ‘বিশ্বশান্তির স্থপতি’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন।
তবে সত্যিই যদি গাজায় অস্ত্র থেমে যায়, মানুষ ঘরে ফিরতে পারে, শিশুদের মৃত্যু থামে—তাহলে সেটিই হবে এই শতকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
এখন প্রশ্ন শুধু একটাই—এই চুক্তি কি সত্যিই স্থায়ী শান্তি আনবে, নাকি এটি কেবল রাজনীতির আরেক অধ্যায়?