ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের ৩টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পর এই সিদ্ধান্ত আসে, যেখানে তার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজ এক গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেন—ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপসের তিনটি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হবে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সংস্থার সহকারী পরিচালক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. ফেরদৌস রহমান আদালতে আবেদন করেন তাপসের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার জন্য। আবেদনে বলা হয়, মেয়র ও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের উৎস বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন।
দুদকের আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তাপসের নামে থাকা ২৭টি ব্যাংক হিসাবে ৫৩৯ কোটি ১৬ লাখ ২৫ হাজার ২৭৮ টাকা এবং ৫ লাখ ১৭ হাজার ৫২৭ মার্কিন ডলার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার অর্জিত সম্পদের মোট মূল্য ধরা হয়েছে ৭৩ কোটি ১৯ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭ টাকায়, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
দুদক জানায়, এসব অর্থ স্থানান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, তাপস তার সম্পদগুলো অন্যত্র স্থানান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে। তাই মামলার নিষ্পত্তির আগে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার্থে এসব সম্পদ ফ্রিজ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।
আদালত বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দুদকের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং শেখ ফজলে নূর তাপসের তিনটি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার নির্দেশ দেন।
দুদকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতি মামলাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। কারণ, শেখ ফজলে নূর তাপস কেবল একজন সাবেক মেয়রই নন, তিনি আওয়ামী লীগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রভাব গভীর হতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন দুদক তাপসের সম্পদের পূর্ণ তালিকা ও ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করছে। প্রাথমিকভাবে তার নামীয়, স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে।
এদিকে, আদালতের আদেশে তার তিনটি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ হওয়ায় তিনি এসব হিসাব থেকে আর কোনো লেনদেন করতে পারবেন না। দুদক এখন তার স্থাবর সম্পদ—জমি, ফ্ল্যাট ও শেয়ারগুলোর দিকেও নজর দিচ্ছে।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এই মামলার ফলাফল বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টায় নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় দুর্নীতি মামলার একটি হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।