পানি ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে মাদাগাস্কারে শুরু হয়েছে ঐতিহাসিক বিক্ষোভ। রাজধানীজুড়ে বিক্ষোভে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পূর্ব-আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কার আবারও দেশব্যাপী তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়েছে। পানির সংকট, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং সরকারের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী আন্তানানারিভোর রাস্তায় নেমে আসেন। মূল নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেন-জি প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা। তারা দাবি তুলেছেন—বর্তমান সরকার ও প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনাকে পদত্যাগ করতে হবে।
সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সমবেত হয়ে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান, প্ল্যাকার্ড ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে শহরের নানা প্রান্তে। সড়ক অবরোধ করতে বিক্ষোভকারীরা ইট-পাথর ও টেলিফোনের খুঁটি ব্যবহার করে ব্যারিকেড তৈরি করেন। আন্দোলন দ্রুত সহিংস রূপ নিলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। টেলিভিশন চ্যানেল ২৪২৪ এমজির ফুটেজে দেখা যায়, ব্যারিকেড ভেঙে বিক্ষোভকারীদের তাড়িয়ে দিচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ান এনটসে ও প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনার পদত্যাগ দাবি করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, জীবনযাত্রার মৌলিক সুবিধা না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে, অথচ সরকার সমস্যার সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
২০২৩ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর এই প্রথমবার এত বড় রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়লেন প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনা। ক্রমবর্ধমান আন্দোলন দমনে গত বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীতে কারফিউ জারি করা হয়েছে। তবুও বিক্ষোভ থামছে না। বরং প্রতিদিনই আন্দোলনে নতুন তরুণ-তরুণীর যোগদান ঘটছে।
গত রোববার আন্তানানারিভোর আনোসিবে এলাকায় এক বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনা স্বীকার করেন, তার সরকারের শাসন ব্যবস্থায় কিছু ভুল ছিল। তিনি বলেন, ‘‘যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে, আমি তা স্বীকার করছি এবং এখন সবকিছু সংস্কারের উপায় খুঁজছি।’’ তবে বিক্ষোভকারীরা বলছেন, শুধু স্বীকারোক্তি নয়, পদত্যাগই এখন একমাত্র সমাধান।
এদিকে, নেপাল ও কেনিয়ার সাম্প্রতিক জেন-জি আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন মাদাগাস্কারের তরুণরা। নেপালে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পতনের মতো উদাহরণ সামনে রেখে তারা একই পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন। অনেকেই নেপালের প্রতীকী পতাকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া কেনিয়ার আন্দোলনের মতোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের সংগঠিত করছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন মাদাগাস্কারের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কারণ, দেশের তরুণ প্রজন্ম এবার সরাসরি নেতৃত্বে এগিয়ে এসেছে এবং তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিলেও আন্দোলন আরও বিস্তার লাভ করছে। প্রতিদিনই দেশের নতুন নতুন অঞ্চলে বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। ফলে প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনার সরকার অভূতপূর্ব রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। এখন প্রশ্ন—জেন-জিদের এই আন্দোলন কেবল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আদায়ে থেমে যাবে, নাকি সত্যিই সরকারের পতন ঘটাবে?