পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ জিও টিভিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে চমকপ্রদ দাবি করেছেন যে, ভবিষ্যতে ভারত যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়, তবে সৌদি আরব নির্দ্বিধায় ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়াবে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে এর কিছু অংশ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের বক্তব্য অনুসারে, চুক্তির ৫ নম্বর ধারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, চুক্তির স্বাক্ষরকারী কোনো দেশের ওপর আক্রমণ মানেই অন্যান্য অংশীদার দেশগুলোর ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
খাজা আসিফ সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমাদের প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ন্যাটোর আদলে তৈরি। এটি কোনো আক্রমণাত্মক বা আগ্রাসী চুক্তি নয়, বরং সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। যদি সৌদি আরব বা পাকিস্তানের ওপর হামলা হয়, তবে উভয় দেশই সম্মিলিতভাবে সেই হামলা প্রতিহত করবে।”
এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের চিরায়ত উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এই চুক্তিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানকে সৌদি বারবার তেল, ঋণ ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। তবে এবার প্রথমবারের মতো দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা ন্যাটো ধাঁচে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল।
সৌদি আরবের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে এমন একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছি যেখানে সামরিক সংক্রান্ত সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। এর ভেতরে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় থেকে শুরু করে সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া পর্যন্ত সবকিছু রয়েছে।”
বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানই পরমাণু শক্তিধর দেশ। যদিও অর্থনৈতিক দিক থেকে পাকিস্তান এশিয়ার দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি, তবে দেশটির সামরিক বাহিনী শক্তিশালী এবং অভিজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ সেনাসদস্য নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশ্বে অন্যতম প্রভাবশালী বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সামরিক শক্তির সঙ্গে সৌদি আরবের বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদের মেলবন্ধন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চোখে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে “সৌদি রিয়াল ও পাকিস্তানি পরমাণু অস্ত্রের বিবাহ” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে সৌদি আরব পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ছাতার ভেতরে ঢুকে পড়লো। যদিও সৌদি আরবের নিজস্ব কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই, তবে পাকিস্তানের সঙ্গে এমন চুক্তি তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিল।
এই ঘোষণার পর ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সামরিক জোট ভারতের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তান ও ভারতের দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।
এদিকে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই চুক্তি নিয়ে উৎসাহ দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশটিতে সৌদি বিনিয়োগ ও সামরিক সহায়তা নতুন আশার আলো বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের একাংশ এই চুক্তিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের এই সামরিক জোট শুধু দুই দেশের সম্পর্ককেই নতুন মাত্রায় নেবে না, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। এখন সময়ই বলে দেবে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি আসলে কতটা কার্যকর হয় এবং ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর এর কী প্রভাব পড়ে।