পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহম্মদ আসিফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি ভারত কখনও পাকিস্তানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়াবে সৌদি আরব।
শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তানের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম জিও টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফকে প্রশ্ন করা হয়— সম্প্রতি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে ভারত যদি পাকিস্তানে হামলা করে, তবে রিয়াদ কি ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়াবে? জবাবে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ৫ নম্বর ধারা ‘যৌথ প্রতিরক্ষা’র কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ, কোনো একটি দেশ আক্রমণের শিকার হলে তা চুক্তির সব সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। খাজা আসিফ আরও বলেন, “এটি ন্যাটোর মতো একটি প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি, যা আক্রমণ নয় বরং প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে। যদি পাকিস্তান বা সৌদি আরবের ওপর হামলা হয়, আমরা একসঙ্গে প্রতিহত করব।”
উল্লেখযোগ্য যে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে বহুল আলোচিত প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও পুরো শর্তাবলি এখনও প্রকাশ করা হয়নি, সৌদির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন— এই চুক্তিতে সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগসহ প্রায় সব ধরনের সামরিক দিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই চুক্তিকে নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সামরিক ঘনিষ্ঠতা শুধু অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র দেশ যার কাছে রয়েছে পরমাণু অস্ত্র। যদিও দেশটি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও দারিদ্র্যপীড়িত, তবুও প্রায় ৬ লাখ সেনাসমৃদ্ধ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি অনেক বিশ্লেষকের চোখে কৌশলগত ভারসাম্যের নতুন অধ্যায়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এমনকি মন্তব্য করেছেন যে, “এই চুক্তি কার্যত সৌদি রিয়াল আর পাকিস্তানি পরমাণু অস্ত্রের মধ্যে এক ধরনের বিবাহ।”
তাদের মতে, যদি এই জোট সক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণও আমূল পরিবর্তিত হতে পারে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনায় ভরপুর, সেখানে সৌদি আরবের প্রকাশ্য অবস্থান ভারতকেও নতুন করে কৌশল নির্ধারণে বাধ্য করবে বলে মনে করছেন তারা।
দুই দেশের নেতারা এখনও বিস্তারিত কোনো যৌথ ঘোষণা দেননি, তবে সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সরাসরি মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া ফেলেছে। অনেকেই মনে করছেন, এই চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ হলে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সামরিক জোটের সূচনা হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।