কাতারে অনুষ্ঠিত হামাস ও ইসরাইলের মধ্যকার আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। ইসরাইল আবারও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এদিকে গাজায় নারী-শিশুসহ নিহত ৫৭ হাজার ছাড়িয়েছে।
কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে প্রথম দফার পরোক্ষ যুদ্ধবিরতি আলোচনা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত থাকা দুই ফিলিস্তিনি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই আলোচনায় কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে বহু প্রত্যাশিত এই আলোচনা একপ্রকার ভেস্তে গেছে বলা চলে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৫৭ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে আরও ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল, এমনকি জাতিসংঘের সহায়তা কেন্দ্রগুলোও।
চলমান এই গণহত্যা বন্ধে জরুরি যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন থাকলেও, ইসরাইল একাধিকবার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সর্বশেষ কাতারে অনুষ্ঠিত আলোচনায় হামাস যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনে আলোচনায় বসার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু ইসরাইল সেই সংশোধিত প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সূত্র। এতে বোঝা যাচ্ছে, ইসরাইল এখনো কঠোর অবস্থান থেকে সরছে না।
গাজার একাধিক এলাকায় প্রতিদিন নতুন করে বোমাবর্ষণ চালাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। রোববার (৬ জুলাই) গাজাজুড়ে ইসরাইলি হামলায় ৮২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে গাজা সিটিতেই মারা গেছে ৩৯ জন। এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
এর আগে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-সমর্থিত 'গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন' (GHF)-এর খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে সহায়তা নিতে গিয়ে ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন আরও ৭৪৩ জন। আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৯১ জনের বেশি।
এই মানবিক বিপর্যয়ের মুখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মধ্যস্থতায় বেশ কয়েক দফা চেষ্টা হয়েছে যুদ্ধবিরতির জন্য। কিন্তু বারবার ইসরাইলের অটল অবস্থানের কারণে সমাধান অধরাই থেকে গেছে।
এমন এক মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, এই সপ্তাহেই হামাসের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ভালো সম্ভাবনা আছে। আমি মনে করি গাজা নিয়ে আমরা একটা চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
তবে বিপরীত চিত্রও উঠে এসেছে ফিলিস্তিনি সূত্রের বক্তব্যে। তারা জানিয়েছে, কাতারে পাঠানো ইসরাইলি প্রতিনিধিদলকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। ফলে প্রকৃতপক্ষে কোনো সমঝোতা বা প্রস্তাব চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী সোমবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এর আগে তিনি বলেছেন, ‘ইসরাইলি আলোচকদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, যুদ্ধবিরতি হতে হবে এমন শর্তে, যা ইসরাইলের জন্য গ্রহণযোগ্য।
তবে বাস্তবতা হলো, ইসরাইলের গ্রহণযোগ্যতা’র সংজ্ঞা এখনো অস্পষ্ট। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যুদ্ধবিরতির নামে যদি ইসরাইল কেবল নিজের অবস্থান জোরালো করতে চায়, তাহলে গাজার জনগণের মুক্তির আশা ক্ষীণ।
এই অবস্থায় গাজার জনগণের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা ও আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করাই এখন একমাত্র পথ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আর তার জন্য প্রয়োজন একটানা আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং যুদ্ধবাজ শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা।