বিশ্বায়নের যুগে বাণিজ্যনীতি এখন কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়—এটি প্রযুক্তি, কূটনীতি এবং ভূরাজনীতির কৌশল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি যেন সেই ঘূর্ণিঝড়, যার প্রভাব এশিয়ার দেশগুলোতে বিশাল ও বহুস্তরীয় সংকট সৃষ্টি করছে।
একদিকে চাপ সৃষ্টি করছে এই অঞ্চলগুলোর রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে, অন্যদিকে বিশ্ববাণিজ্যের কাঠামোও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
এশিয়ায় চিপ উৎপাদন, বস্ত্রশিল্প, গাড়ির যন্ত্রাংশ—এসব খাত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রমুখী। একসময় এসব কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য মনে করত, কিন্তু আজকের বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রই হয়ে উঠেছে তাদের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার উৎস।
টান ইউ কং-এর প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাউন্ড্রিজ, যা এএমডি, কোয়ালকম, ব্রডকমের মতো জায়ান্টদের চিপ তৈরি করে, এখন যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখতে মরিয়া। তারা যেমন চিপ সরবরাহ করছে, তেমনি এখন ভবিষ্যৎকেও নতুন করে সাজাচ্ছে ট্রাম্পের শুল্ক-অনিশ্চয়তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে।
টান বলেন, আমরা আর বিশ্বায়নের পথে নেই, বরং আঞ্চলিককরণে যাচ্ছি।
১ আগস্ট থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে ১০-৬০ শতাংশ নতুন শুল্ক। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম—সব দেশের ওপরই চোখ রাঙাচ্ছে হোয়াইট হাউস।
সেমিকন্ডাক্টরে এখনো সরাসরি শুল্ক আরোপ হয়নি, তবে বারবার হুমকি আসছে ট্রাম্পের কাছ থেকে। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও নির্ভরযোগ্যভাবে করতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞ অপর্ণা ভরদ্বাজ বলছেন, প্রতিদিন নীতি বদলালে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা কিভাবে সম্ভব?
ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, এআই চিপ রপ্তানিতে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে কড়াকড়ি আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ—এই প্রযুক্তি চীনে পাচার হচ্ছে।
এ কারণে গ্লোবাল ফাউন্ড্রিজসহ অনেক কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু এর খরচ বহন করা দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জিং হবে।
শুল্কের ক্ষেত্রে এশিয়ার ওপর সবচেয়ে বেশি আঘাত আসছে—জাপান ২৪%, দক্ষিণ কোরিয়া ২৫%, ভিয়েতনাম সর্বোচ্চ ৪৬% হারে শুল্কের ঝুঁকিতে। যদিও ৯০ দিনের বিরতি দিয়ে তা কমিয়ে ১০% করা হয়েছিল, কিন্তু সেটা ২ এপ্রিল থেকে পুরোনো হারেই ফিরছে।
ভিয়েতনাম একমাত্র দেশ যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কচুক্তি করেছে—তাদের রপ্তানিতে ২০% শুল্ক, কিন্তু আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বসুলভ আচরণে চিড় ধরেছে।” এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মিত্র অস্ট্রেলিয়াও বলছে, “আমাদের ওপর শুল্ক থাকা উচিত নয়।”
কম্বোডিয়ার মতো দরিদ্র দেশের পক্ষে ৪৯% শুল্ক কোনোভাবেই সামলানো সম্ভব নয়।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে অনেক কোম্পানি চীন ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কার্যক্রম বিস্তার করেছে—এটাই ‘চায়না + ১’ কৌশল।
তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা, কিন্তু শুল্ক হারে অসঙ্গতি ও প্রতিনিয়ত নীতির পরিবর্তনে এই পথেও বিপদ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়ার কিছু দেশ যেমন ভারত তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ বাজার বড়। কিন্তু সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, চীনসহ অনেক দেশ রপ্তানিনির্ভর—তাদের ওপরই বড় ধাক্কা আসছে।
পুষণ দত্ত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর একমাত্র নেতা নয়। এখন বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্ব নিয়ে চীন এগিয়ে আসছে।
যে দেশগুলো আগে যুক্তরাষ্ট্রের ছাতার নিচে ছিল, তারা এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কেবল তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে—যুক্তরাজ্য, চীন ও ভিয়েতনাম।
এশিয়ার ব্যবসাবান্ধব দেশগুলো এখন উল্টো পথে হাঁটছে—তারা বাণিজ্য উন্মুক্ত করছে।
ফলাফল:
-
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য কমে যাচ্ছে
-
চীন ও অন্যান্য এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য বাড়ছে
পুষণ দত্ত বলেন, “রাজাকে সালাম দাও, তারপর নিজের মতো চলো।”
এই প্রবাদের মতোই এশিয়ার দেশগুলো এখন আর অপেক্ষা করছে না—তারা নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়তে শুরু করেছে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি শুধু এশিয়াকে নয়, গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকেই এক অনিশ্চয়তার মোড়কে জড়িয়ে ফেলেছে। এখন সময় এসেছে বিকল্প পথ ও নেতৃত্ব খোঁজার—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নয়, হয়তো নতুন বিশ্বনেতা হয়ে উঠবে এশিয়া নিজেই।