সম্প্রতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৩ সালের উচ্চশিক্ষার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ ও ফেলোশিপ কর্মসূচিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষত, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর ইরাসমাস মুন্ডাস এবং জাপানের মনবুকাগাকুশো (মনবুশো) স্কলারশিপের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রোগ্রামগুলোতে ভারতের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ যেখানে প্রায় ২০-২৫%, সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মাত্র ৩-৫% এর আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এমনকি পাকিস্তানের মতো দেশও অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। এই পরিসংখ্যান আমাদের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণের পথে এক বড় প্রতিবন্ধকতাকে নির্দেশ করে এবং বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এই পিছিয়ে পড়ার নেপথ্যে রয়েছে বহুবিধ জটিল কারণ, যার মধ্যে অন্যতম হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও তথ্যের অভাব। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) যদিও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে, কিন্তু স্কলারশিপ সংক্রান্ত সুসংগঠিত ডেটাবেজ বা শিক্ষার্থীদের জন্য ওয়ান-স্টপ গাইডেন্স সেন্টারের অভাব প্রকট। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা জানেই না কোন স্কলারশিপের জন্য কখন আবেদন করতে হবে, আবেদনের প্রক্রিয়া কী বা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন কী। এছাড়া, ইংরেজি ভাষার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রস্তাবনা (Research Proposal) তৈরি করার অভিজ্ঞতার অভাবও একটি বড় কারণ। আমাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠ্যক্রমগুলো প্রায়শই আন্তর্জাতিক গবেষণা মেথডোলজি এবং ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, যা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যদিও দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দিচ্ছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম মূলত দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানমুখী, আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা প্রায় অনুপস্থিত। এটি একটি বড় ঘাটতি, কারণ অনেক আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ প্রোগ্রাম কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) দেশের তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করলেও, বৈশ্বিক স্কলারশিপের প্রয়োজনীয়তা পূরণে তাদের কর্মসূচির অভিযোজন সীমিত। আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের জন্য শুধুমাত্র একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বই যথেষ্ট নয়, বরং নেতৃত্বগুণ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রাসঙ্গিক দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। এনএসডিএ'র বর্তমান কাঠামো মূলত স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে নিবদ্ধ, আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজনীয় 'সফট স্কিল' যেমন — আন্তর্জাতিক ইন্টারভিউ দক্ষতা, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ (Statement of Purpose) লেখা বা রেফারেন্স লেটার সংগ্রহ করার কৌশল শেখানোর মতো কর্মসূচি তাদের আওতায় নেই বললেই চলে। এছাড়াও, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল। মানসম্মত জার্নালে প্রকাশনার সংখ্যা কম হওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্তির অভাবে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ বোর্ডের কাছে নিজেদের যোগ্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে, পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা অভিজ্ঞতার ওপর অনেক গুরুত্ব দেয়, যা আমাদের অনেক শিক্ষার্থীরই থাকে না।
| স্কলারশিপ প্রোগ্রাম | মোট বৈশ্বিক প্রাপ্যতা (বার্ষিক) | বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তি (২০২৩) | প্রাপ্তির হার (%) | দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রাপ্তির হার (ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা) (%) |
|---|---|---|---|---|
| ইরাসমাস মুন্ডাস (EU) | প্রায় ২,০০০ | ৬৭ | ৩.৩৫% | ২০-২৫% |
| মনবুকাগাকুশো (জাপান) | প্রায় ১,৫০০ | ৫০ | ৩.৩৩% | ১৫-২০% |
| ফুলব্রাইট (USA) | প্রায় ৪,০০০ | ৭৫ | ১.৮৭% | ১০-১৫% |
| কমনওয়েলথ স্কলারশিপ (UK) | প্রায় ৮০০ | ২২ | ২.৭৫% | ১০-১২% |
উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, এবং সংশ্লিষ্ট স্কলারশিপ প্রোগ্রামগুলির বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৩।
সুপারিশ
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি-কে যৌথভাবে 'জাতীয় স্কলারশিপ ডেটাবেজ ও গাইডেন্স সেন্টার' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে সকল আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের তথ্য, আবেদনের সময়সীমা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং সফল আবেদনকারীদের অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত একটি ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করা হবে। এই সেন্টারটি 'উচ্চশিক্ষা আন্তর্জাতিকীকরণ নীতিমালা, ২০২৪' (প্রস্তাবিত) এর অধীনে কাজ করবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করবে, যা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রস্তাবনা ও ব্যক্তিগত প্রবন্ধ লেখায় সহায়তা করবে।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে 'গ্লোবাল স্কলারশিপ প্রিপারেশন মডিউল' অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই মডিউলে ইংরেজি ভাষা দক্ষতা (IELTS/TOEFL), আন্তর্জাতিক ইন্টারভিউ কৌশল, নেতৃত্বগুণ বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক মানের সিভি তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এর বাস্তবায়নে 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০১২' (সংশোধিত) এর আওতায় একটি নতুন প্রবিধান যুক্ত করা যেতে পারে, যা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
- BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা ও প্রকাশনার একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার জন্য গবেষকদের আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সাথে সংযোগ স্থাপনে উৎসাহিত করতে হবে। 'বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন, ১৯৭৩' (সংশোধিত) এর অধীনে গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল (Research and Innovation Fund) গঠন করে এই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যেতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির জন্য অপরিহার্য গবেষণা অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করবে।