সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ (U.S. Department of Commerce) সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, যা এশিয়ার প্রযুক্তি সাপ্লাই চেইনে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পদক্ষেপ কেবল উচ্চ-প্রযুক্তির চিপের উৎপাদন ও সরবরাহে বেইজিংয়ের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে, বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং এর আশপাশের অঞ্চলে। তাইওয়ানের TSMC (Taiwan Semiconductor Manufacturing Company) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার Samsung Electronics-এর মতো জায়ান্টরা, যারা বিশ্বব্যাপী উন্নত চিপের সিংহভাগ উৎপাদন করে, তাদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পড়ছে। এই কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন কৌশল এবং সাপ্লাই চেইনকে পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হচ্ছে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য এক মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি করেছে – একদিকে যেমন নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে, কিন্তু এর ফলস্বরূপ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি নতুন ভূ-অর্থনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাপানের Rapidus এবং ভারতের Semiconductor Mission-এর মতো উদ্যোগগুলো চিপ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে, যা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের ফাটলগুলোকে আরও গভীর করছে। ভিয়েতনামের Intel এবং মালয়েশিয়ার Infineon-এর মতো কোম্পানিগুলো মার্কিন বিনিয়োগের মাধ্যমে চিপ অ্যাসেম্বলি এবং টেস্টিং সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, যা চীন-নির্ভরতা কমানোর একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। এই স্থানান্তর কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আঞ্চলিক শ্রমবাজার এবং দক্ষ জনশক্তির চাহিদাতেও পরিবর্তন আনছে। সিঙ্গাপুর, যা দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরপেক্ষ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, তারাও তাদের চিপ শিল্পে মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্রিয় হয়েছে, যা এশীয় দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এবং একই সাথে বৈশ্বিক চিপ বাজারের অস্থিরতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বিভিন্ন নীতিগত কৌশল অবলম্বন করছে।
এই ভূ-অর্থনৈতিক মেরুকরণ কেবল প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও দৃশ্যমান। দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মতো ঐতিহ্যবাহী মার্কিন মিত্ররা তাদের নিজস্ব চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, যা তাদের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করছে। অন্যদিকে, ASEAN সদস্য রাষ্ট্রগুলো, যেমন ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড, উভয় পরাশক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যাতে তারা চিপ সাপ্লাই চেইনের সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত না হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-ও এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার গুরুত্ব নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনা শুরু করেছে, বিশেষ করে যখন BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন UN Peacekeeping মিশনগুলোতেও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ পরাশক্তিদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিভাজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। চিপের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই যুদ্ধ কেবল সিলিকনের টুকরার জন্য নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি মূল ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
| দেশ | গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ/বিনিয়োগ | সাল | আনুমানিক বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) | নীতিগত প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| ভারত | Semiconductor Mission (মাইক্রন টেকনোলজি ফ্যাক্টরি) | ২০২২-২০২৭ | ১০.০ | উৎপাদন-সংযুক্ত প্রণোদনা (PLI) স্কিম, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি |
| জাপান | Rapidus কর্পোরেশন (2nm চিপ উৎপাদন) | ২০২২-২০২৫ | ~৭.২ (সরকার ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব) | দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব |
| ভিয়েতনাম | Intel-এর অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং প্ল্যান্ট সম্প্রসারণ | ২০২১-২০২৫ | ~১.৫ (অতিরিক্ত বিনিয়োগ) | সাপ্লাই চেইন বৈচিত্র্যকরণ, মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণ |
| দক্ষিণ কোরিয়া | জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর মেগাক্লাস্টার প্রতিষ্ঠা | ২০২৩-২০৪২ | ~৪২০.০ (বেসরকারি বিনিয়োগ) | গবেষণা ও উন্নয়ন, উন্নত চিপ উৎপাদন, সাপ্লাই চেইন স্থিতিশীলতা |
উৎস: U.S. Department of Commerce, India Semiconductor Mission, Japan Ministry of Economy, Trade and Industry (METI), Intel Corporation, South Korea Ministry of Trade, Industry and Energy।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'প্রযুক্তি কূটনীতি সেল' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার প্রধান কাজ হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও জাপানের প্রযুক্তি নীতি বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরি করা এবং WTO-এর প্রযুক্তি স্থানান্তর সংক্রান্ত বিধিমালা ব্যবহার করে দেশীয় প্রযুক্তি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
- BIMSTEC সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি 'আঞ্চলিক চিপ সাপ্লাই চেইন স্থিতিশীলতা চুক্তি' (Regional Chip Supply Chain Stability Agreement) স্বাক্ষর করা হোক, যা আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর উপাদান ও প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করবে এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কেন্দ্র স্থাপন করবে।
- জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা (UN Peacekeeping) মিশনে অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC)-এর স্থায়ী সদস্যদের সাথে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে চিপ যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে একটি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে UN Charter-এর অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংক্রান্ত ধারাগুলো মেনে চলার জন্য উভয় পরাশক্তিকে উৎসাহিত করা।