ব্যাংকিং খাতের ডলার সংকট: তারল্যের চাপ ও সুদের হারের অস্থিরতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ব্যাংকিং খাতের ডলার সংকট: তারল্যের চাপ ও সুদের হারের অস্থিরতা

রাশেদ চৌধুরী  avatar   
রাশেদ চৌধুরী
ব্যাংকিং খাতের ডলার সংকট: তারল্যের চাপ ও সুদের হারের অস্থিরতা
ব্যাংকিং খাতের ডলার সংকট: তারল্যের চাপ ও সুদের হারের অস্থিরতা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে, যা দেশ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে, যা দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্যের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আন্তঃব্যাংক ডলার লেনদেনের গড় দৈনিক পরিমাণ পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে, যা ডলারের জোগান ও চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান গভীর ভারসাম্যহীনতার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। এই সংকট কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরই চাপ ফেলছে না, বরং স্থানীয় মুদ্রার তারল্য এবং সামগ্রিক সুদের হারের ওপরও এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডলার সংকটের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহের তুলনায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি। যদিও গত কয়েক মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে, তা ক্রমবর্ধমান আমদানি বিল মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে, জ্বালানি তেল, মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে বাজারকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করতে বাধ্য করছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগত ক্ষয় হচ্ছে, যা আইএমএফের বিপিএম৬ (ব্যালেন্স অফ পেমেন্টস ম্যানুয়াল ৬) পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এই রিজার্ভের চাপ ব্যাংকগুলোকে তাদের নিজস্ব ডলার ধরে রাখতে উৎসাহিত করছে, যার ফলে আন্তঃব্যাংক ডলার বাজারে তারল্যের প্রবাহ আরও কমে যাচ্ছে এবং ডলারের বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোকে আমদানিকারকদের জন্য লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) খুলতে নিরুৎসাহিত করছে, যা উৎপাদন খাতে কাঁচামাল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি করছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করছে। BIBM (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক ব্যাংকই ডলার সংকটের কারণে ট্রেড ফাইন্যান্সিং কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (SME) বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ডলার সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মুদ্রার তারল্য এবং সুদের হারের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন বাজার থেকে ডলার বিক্রি করে, তখন বিপরীতে সমপরিমাণ টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়, যা স্থানীয় মুদ্রার তারল্যকে আরও সংকুচিত করে। এই তারল্য সংকট ব্যাংকগুলোকে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অধিক সুদে তহবিল সংগ্রহ করতে বাধ্য করছে, যার ফলে কল মানি মার্কেট এবং অন্যান্য স্বল্পমেয়াদী ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে কল মানি মার্কেটে সুদের হার ৮-৯ শতাংশ অতিক্রম করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সম্প্রতি প্রবর্তিত স্মার্ট (সিক্স মান্থস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অফ ট্রেজারি বিল) হার ভিত্তিক সুদের করিডর পদ্ধতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণের সুদের হার নির্ধারণে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যদিও এই পদ্ধতি সুদের হারকে বাজারমুখী করার লক্ষ্য নিয়ে প্রবর্তিত হয়েছে, তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংকই তাদের ঋণ পোর্টফোলিওতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি আনতে পারছে না, কারণ উচ্চ সুদের হার অনেক বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এই তারল্য সংকটের বাইরে নয়; তাদের আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যা তাদের মুনাফাকেও প্রভাবিত করছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রকাশিত তথ্যানুসারে, বেশ কয়েকটি সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি পজিশন নেতিবাচক দিকে চলে গেছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক লেনদেনের সক্ষমতা হ্রাস করছে।

সূচক ২০২২ (ডিসেম্বর) ২০২৩ (ডিসেম্বর) ২০২৪ (ফেব্রুয়ারি)
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিলিয়ন ডলার, BPM6) ৩২.৬ ১৯.৯ ১৯.৪
আন্তঃব্যাংক ডলার লেনদেন (দৈনিক গড়, মিলিয়ন ডলার) ১১০ ৭৫ ৬৫
কল মানি সুদের হার (গড়, %) ৬.৫০ ৮.২০ ৮.৯০
আমদানি এলসি খোলা (বিলিয়ন ডলার) ৬.১ ৪.৯ ৪.৩

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় আরও বিচক্ষণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, বিশেষ করে নন-এসেনশিয়াল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে বিদ্যমান নীতিগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
  • আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি নিয়মিত তদারকি করতে হবে এবং প্রয়োজনে সুনির্দিষ্ট নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে তারা কল মানি বাজার বা অন্যান্য উচ্চ সুদের উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী আমানত সংগ্রহের ওপর জোর দিতে পারে।
  • BIBM এর গবেষণা ও বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে, বাংলাদেশ ব্যাংককে স্মার্ট (SMART) হারভিত্তিক সুদের করিডর পদ্ধতির কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে বর্তমান তারল্য সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি নমনীয় মুদ্রানীতি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যা ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রবাহ সচল রাখতে এবং একইসাথে সুদের হারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাশেদ চৌধুরী

রাশেদ চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্যাংকিং, মানি মার্কেট ও সুদের হার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator