ই-স্পোর্টস ও গেমিং: পেশাদারিত্বের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের তরুণরা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ই-স্পোর্টস ও গেমিং: পেশাদারিত্বের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের তরুণরা

তানজিম আহমেদ  avatar   
তানজিম আহমেদ
ই-স্পোর্টস ও গেমিং: পেশাদারিত্বের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের তরুণরা
ই-স্পোর্টস ও গেমিং: পেশাদারিত্বের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের তরুণরা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) আয়োজিত ‘জাতীয় ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতা ২০২৩’-এর সফল সমাপ্তি দেশের গেমিং শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) আয়োজিত ‘জাতীয় ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতা ২০২৩’-এর সফল সমাপ্তি দেশের গেমিং শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার তরুণ প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে তাদের মেধা ও কৌশল প্রদর্শন করেছেন, যা প্রমাণ করে ই-স্পোর্টস শুধু বিনোদন নয়, এটি এখন একটি সম্ভাব্য পেশাদার ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এ ধরনের আয়োজন দেশের তরুণদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করছে, পেশাদার ই-স্পোর্টস খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে তাদের সামনে এখনো বহু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, যা সামগ্রিক ই-স্পোর্টস ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে একটি বড় বাধা।

বাংলাদেশের ই-স্পোর্টস খাত বর্তমানে একটি উল্লম্ফনকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একদিকে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে, অন্যদিকে অবকাঠামোগত ও নীতিগত দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। World Bank-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ দ্রুতগতিতে হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে গেমিং ও ই-স্পোর্টস। তবে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রতুলতা, বিশেষ করে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায়, পেশাদার গেমিংয়ের জন্য একটি মৌলিক সমস্যা। একটি স্থিতিশীল ও নিম্ন ল্যাটেন্সির ইন্টারনেট সংযোগ ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য, যা অনেক তরুণ খেলোয়াড়দের নাগালের বাইরে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মানের গেমিং হার্ডওয়্যার ও পেরিফেরালসের উচ্চ মূল্যও একটি বড় বাধা। দেশীয় বাজারে এই পণ্যগুলোর সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় তাদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পেতেন। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ ভিশন বাস্তবায়নে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দেওয়া হলেও, ই-স্পোর্টস-কেন্দ্রিক সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে এখনো পিছিয়ে আছে।

পেশাদার ই-স্পোর্টস ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক স্বীকৃতির অভাব বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আরেকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপের দেশগুলোতে ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়রা সুনির্দিষ্ট বেতন, স্পনসরশিপ ও পুরস্কারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, সেখানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো এই ধরনের অর্থনৈতিক মডেল পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। Asian Development Bank (ADB)-এর ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন সম্পর্কিত গবেষণায় দেখা গেছে, উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে নতুন পেশা তৈরি হলেও সেগুলোর জন্য সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে সময় লাগে। বাংলাদেশে গেমিংকে এখনো নিছক বিনোদন হিসেবে দেখা হয়, পেশা হিসেবে এর সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত কম। এর ফলে, তরুণ খেলোয়াড়রা পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে যথেষ্ট সমর্থন পান না, যা তাদের পেশাদার ক্যারিয়ার গড়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া, ই-স্পোর্টস টিমের জন্য স্পনসরশিপ, লিগ ও টুর্নামেন্টের নিয়মিত আয়োজন এবং খেলোয়াড়দের জন্য স্বাস্থ্যবীমা ও অবসরকালীন সুবিধা নিশ্চিত করা এখন পর্যন্ত একটি সুদূরপরাহত স্বপ্ন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, এই উদীয়মান খাতকে স্বীকৃতি দিয়ে নীতিগত সহায়তা দিলে এই চিত্র পরিবর্তন হতে পারে।

খাত ২০২১ সালের বাজার মূল্য (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ২০২৫ সালের পূর্বাভাস (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বার্ষিক বৃদ্ধির হার (CAGR) বাংলাদেশে ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়দের সংখ্যা (আনুমানিক)
বৈশ্বিক ই-স্পোর্টস বাজার ১.০৮ ১.৬২ ১০.৪% -
বৈশ্বিক গেমিং বাজার ১৮০.৩ ২৬৮.৮ ৭.৮% -
বাংলাদেশের গেমিং ও ই-স্পোর্টস বাজার (আনুমানিক) ০.০৫ (৫০ মিলিয়ন) ০.১ (১০০ মিলিয়ন) ১৫.০% ২ মিলিয়নের বেশি (নিয়মিত)

উৎস: Newzoo Global Esports & Live Streaming Market Report (২০২২), Statista, এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)-এর অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ যৌথভাবে একটি 'জাতীয় ই-স্পোর্টস নীতি' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে পেশাদার খেলোয়াড়দের স্বীকৃতি, লাইসেন্সিং, আর্থিক প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য তহবিল বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকবে।
  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দেশের সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ই-স্পোর্টস উপযোগী উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ (ন্যূনতম ১০০ এমবিপিএস) নিশ্চিত করবে এবং গেমিং হার্ডওয়্যার আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করে স্থানীয় বাজারে সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ই-স্পোর্টস স্টার্টআপ এবং গেমিং টিমগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ ও বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান করবে, পাশাপাশি কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কর্মসূচির আওতায় ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্ট ও প্রতিভা অন্বেষণ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিম আহমেদ

তানজিম আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator