সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও পেশাগত অনিশ্চয়তা নিরসনের লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের প্রজ্ঞাপনটি গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সরকার কর্তৃক জারিকৃত এই প্রজ্ঞাপনে সংবাদপত্র এবং সংবাদ সংস্থায় কর্মরত সাংবাদিকদের পদবি, পদমর্যাদা ও গ্রেড সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, যা এতদিন পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট ছিল। এই প্রজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো সংবাদকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা, যাতে তাদের পদমর্যাদার ভিত্তিতে বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ গ্রেড থেকে শুরু করে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত প্রতিটি পদের দায়িত্ব ও অবস্থান স্পষ্ট করার ফলে সংবাদপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে, যা মূলত গণমাধ্যম শিল্পের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মাঠ পর্যায়ে এর যথাযথ বাস্তবায়নে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ভুক্তভোগী সাংবাদিক। অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানেই এখনো পুরোনো পদবিতে কর্মীদের কাজ চালিয়ে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে, যার ফলে গ্রেড অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সংবাদকর্মী জানিয়েছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক খামখেয়ালিপনা এবং সঠিক তদারকির অভাবে প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাগুলো কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বিশেষ করে শিক্ষানবিশ সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে পদবি নির্ধারণ এবং তাদের নিয়মিতকরণের বিষয়টি এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে অস্পষ্ট। কর্মক্ষেত্রে যথাযথ মর্যাদা না পাওয়া এবং পদবি অনুযায়ী গ্রেডভুক্ত না হওয়ায় অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক পেশাগত হতাশায় ভুগছেন, যা তাদের কর্মক্ষমতাকে ব্যাহত করছে এবং সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার মানকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এই প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ এবং সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তায়। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও মালিকপক্ষের গড়িমসি এবং কার্যকর নজরদারির অভাবই এই অচলাবস্থার মূল কারণ। যদিও প্রজ্ঞাপনে সম্পাদক থেকে শুরু করে শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তবুও অনেক ক্ষেত্রে করপোরেট স্বার্থে পদবি ও গ্রেড নির্ধারণে অনিয়ম করা হচ্ছে। সংবাদ সংস্থা এবং সংবাদপত্রগুলোর জন্য আলাদাভাবে গ্রেড বিন্যাস থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অডিট পরিচালনা করা এবং যারা প্রজ্ঞাপন মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে শ্রম আইনের আওতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে সাংবাদিকরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।
সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় এই সরকারি প্রজ্ঞাপনটি কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং এটি গণমাধ্যম কর্মীদের আত্মসম্মান ও শ্রমের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার একমাত্র রক্ষাকবচ। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক সময়ে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রতিটি সংবাদকর্মীর উচিত নিজ নিজ পদবি ও গ্রেড সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে শ্রম আদালতে আইনি সুরক্ষা চাওয়া। গণমাধ্যম শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব এবং সাংবাদিকদের মানসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে আগামীতে এই প্রজ্ঞাপনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত পর্যালোচনার কোনো বিকল্প নেই, অন্যথায় এই শিল্পের মেধাবী কর্মীরা পেশা ছেড়ে অন্য খাতে চলে যাওয়ার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে।