ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও এক্সিট স্ট্র্যাটেজি: বাংলাদেশের স্টার্টআপের ভবিষ্যৎ কি শুধু পুঁজি বৃদ্ধির গোলকধাঁধা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও এক্সিট স্ট্র্যাটেজি: বাংলাদেশের স্টার্টআপের ভবিষ্যৎ কি শুধু পুঁজি বৃদ্ধির গোলকধাঁধা?

শাহরিয়ার নাফিস  avatar   
শাহরিয়ার নাফিস
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও এক্সিট স্ট্র্যাটেজি: বাংলাদেশের স্টার্টআপের ভবিষ্যৎ কি শুধু পুঁজি বৃদ্ধির গোলকধাঁধা?
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও এক্সিট স্ট্র্যাটেজি: বাংলাদেশের স্টার্টআপের ভবিষ্যৎ কি শুধু পুঁজি বৃদ্ধির গোলকধাঁধা?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) বিনিয়োগে এক উল্লেখযোগ্য মন্দা দেখা গেছে, যা পূর্ববর্তী বছরে...

সম্প্রতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) বিনিয়োগে এক উল্লেখযোগ্য মন্দা দেখা গেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০% হ্রাস পেয়েছে। এই সংকোচন কেবল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগই সৃষ্টি করেনি, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা এবং উচ্চ সুদের হারের মুখে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাকেও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষত, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলের জন্য প্রণীত নতুন প্রবিধানমালা এবং তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরণের দোদুল্যমানতা তৈরি করেছে, যা অনেক উচ্চাভিলাষী স্টার্টআপের জন্য তহবিল সংগ্রহকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে, বাংলাদেশের স্টার্টআপের ভবিষ্যৎ কি কেবল পুঁজি বৃদ্ধির একটি গোলকধাঁধা, নাকি টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং সফল এক্সিট স্ট্র্যাটেজির জন্য আরও গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন?

স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে কেবল পুঁজি ঢালাই এক্সিট স্ট্র্যাটেজির সফলতার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এক্সিট স্ট্র্যাটেজি মূলত অধিগ্রহণ (Acquisition) এবং সেকেন্ডারি সেল (Secondary Sale)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে, যেখানে ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (IPO) বা মার্জার (Merger) তুলনামূলকভাবে বিরল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক ভিসি ফান্ডগুলো প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করলেও, সফল এক্সিট ইভেন্টের সংখ্যা হাতে গোনা। এর প্রধান কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো, স্থানীয় মূলধন বাজারে স্টার্টআপদের তালিকাভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও প্রবিধানমালার অভাব এবং বাজারের গভীরতার স্বল্পতা। ন্যাশনাল বোর্ড অফ রেভিনিউ (এনবিআর) কর্তৃক স্টার্টআপদের জন্য কর অবকাশ এবং সরলীকৃত কর কাঠামোর ঘোষণা ইতিবাচক হলেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি স্টার্টআপ-বান্ধব হয়ে ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ, অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্টের উপর অযৌক্তিক কর আরোপের বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে, যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে নির্দেশ করে। একটি স্টার্টআপ যখন সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, তখন তার বিনিয়োগকারীদের তহবিল ফেরত পাওয়ার পথ, অর্থাৎ এক্সিট স্ট্র্যাটেজিই বিনিয়োগের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই এক্সিট পথগুলি স্পষ্ট না হলে, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে, যা পুরো ইকোসিস্টেমের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।

পুঁজি সংগ্রহের পাশাপাশি স্টার্টআপগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের ব্যবসায়িক মডেলের উদ্ভাবনী শক্তি এবং বাজারের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা। অনেক সময় দেখা যায়, কেবল ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সহজলভ্যতা স্টার্টআপগুলোকে তাদের মূল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং তারা কেবল পরবর্তী ফান্ডিং রাউন্ডের দিকে মনোনিবেশ করে। এর ফলে, টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিবর্তে তারা একটি 'ফান্ডিং গোলকধাঁধা'য় আটকা পড়ে, যেখানে নতুন পুঁজি আকর্ষণ করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, অথচ দীর্ঘমেয়াদী লাভজনকতা বা বাজারের শেয়ার বাড়ানোর দিকে তাদের মনোযোগ কমে যায়। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি) স্টার্টআপদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য কিছু সহায়তা প্রদান করলেও, প্রযুক্তি-ভিত্তিক স্টার্টআপদের জন্য নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সাথে সংযোগ স্থাপনের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম এখনও সীমিত। এই সীমাবদ্ধতা স্থানীয় স্টার্টআপদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের এক্সিট স্ট্র্যাটেজিকে আরও সংকীর্ণ করে তুলছে। বিএসইসি’র বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলের নীতিমালা, যা মূলত বেসরকারি ইক্যুইটি এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাতে স্টার্টআপদের জন্য আরও নমনীয় এক্সিট পথ তৈরির সুযোগ থাকা উচিত। বিশেষ করে, এসএমই বোর্ড বা অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি)-তে স্টার্টআপদের তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় রিটার্ন নিশ্চিত করার কৌশলগুলি নিয়ে আরও কাজ করা প্রয়োজন।

অর্থবছর মোট ভিসি বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) সফল এক্সিট ইভেন্ট (সংখ্যা) এক্সিট প্রকার (প্রধানত) জিডিপিতে স্টার্টআপের অবদান (%)
২০১৮-১৯ ৮৫ অধিগ্রহণ ০.০৫
২০১৯-২০ ১২০ অধিগ্রহণ, সেকেন্ডারি সেল ০.০৭
২০২০-২১ ১৫৫ অধিগ্রহণ, সেকেন্ডারি সেল ০.০৯
২০২১-২২ ২০০ ১০ অধিগ্রহণ, সেকেন্ডারি সেল ০.১২
২০২২-২৩ ১৮০ অধিগ্রহণ, সেকেন্ডারি সেল ০.১১
২০২৩-২৪ (প্রথমার্ধ) ৬৫ অধিগ্রহণ ০.০৪

উৎস: বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যাসোসিয়েশন (বিভিসিএ), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), বিএসইসি বার্ষিক প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এবং এসএমই প্ল্যাটফর্মে স্টার্টআপদের তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে হবে। এর জন্য 'বিএসইসি অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড রুলস, ২০১৫' এবং 'এসএমই প্ল্যাটফর্ম রুলস, ২০১৯' সংশোধন করে স্টার্টআপ-বান্ধব এক্সিট নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেখানে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন এবং লভ্যাংশের শর্ত শিথিল করা হবে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল বোর্ড অফ রেভিনিউ (এনবিআর) সমন্বিতভাবে স্টার্টআপদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'স্টার্টআপ ট্যাক্স ইনসেনটিভ পলিসি' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্টের উপর অযৌক্তিক কর প্রত্যাহার এবং সফল এক্সিট ইভেন্টের উপর ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্সকে একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য হ্রাস করার বিধান থাকবে, যা 'আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪'-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সংশোধন করে কার্যকর করা যেতে পারে।
  • এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি 'টেক-স্টার্টআপ এক্সপোর্ট ফ্যাসিলিটেশন ইউনিট' গঠন করবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক অধিগ্রহণকারীদের সাথে স্থানীয় স্টার্টআপদের সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করবে। এই ইউনিট আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড এবং কর্পোরেট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (CVC) প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে নিয়মিত 'রোডশো' এবং 'ইনভেস্টর সামিট' আয়োজনের মাধ্যমে কার্যকর এক্সিট স্ট্র্যাটেজির পথ প্রশস্ত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহরিয়ার নাফিস

শাহরিয়ার নাফিস 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্টার্টআপ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator