বাংলাদেশের নাট্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনের বহুমাত্রিক প্রতিভা আবদুল্লাহ আল মামুনের ১৮তম প্রয়াণ দিবস আজ। ২০০৮ সালের ২১ আগস্ট তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমানোর পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও তাঁর শিল্পকর্মের আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি। মঞ্চ থেকে টেলিভিশন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের মেধা ও মননের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। একজন অভিনেতা, নাট্যকার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তিনি যে উচ্চতা স্পর্শ করেছিলেন, তা সমসাময়িক শিল্পীদের জন্য আজও এক অনন্য মাইলফলক। তাঁর প্রয়াণ দিবসে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে এই নাট্যগুরুকে, যিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, বরং ছিলেন এক প্রজন্মের পথপ্রদর্শক ও অভিভাবক।
আবদুল্লাহ আল মামুনের নাট্যদর্শন মূলত আবর্তিত হয়েছে মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা এবং সমকালীন সংকটকে কেন্দ্র করে। তিনি যখনই কোনো নাটক পরিচালনা করেছেন বা অভিনয় করেছেন, তাতে ফুটে উঠেছে সমাজের প্রতি তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ। তাঁর কাজে সবসময়ই বাস্তবতার এক সূক্ষ্ম স্পর্শ পাওয়া যেত, যা সাধারণ দর্শকদের সাথে নিবিড় সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বর্ণালী সময়ে তাঁর নির্মিত নাটকগুলো আজও দর্শকদের স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর হাত ধরে অসংখ্য শিল্পী ও নির্মাতা তৈরি হয়েছেন, যারা পরবর্তী সময়ে বাংলা নাটকের মূলধারাকে এগিয়ে নিয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতা ছিল বহুমুখী, যার ফলে মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের পর্দাতেও তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রয়াণে বাংলা সংস্কৃতিতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা আজও অপূরণীয়। তবে তাঁর রেখে যাওয়া কাজগুলো বর্তমান সময়ের তরুণ নির্মাতাদের জন্য একটি পাঠ্যবইয়ের মতো। নাট্যব্যক্তিত্বরা মনে করেন, তাঁর শিল্পদর্শনকে চর্চার মধ্যে রাখাই হবে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। যদিও প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে আরও জোরালো উদ্যোগের দাবি রয়েছে, তবুও তাঁর কর্মই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে কোটি মানুষের হৃদয়ে। নাট্যগুরু হিসেবে তাঁর যে প্রভাব, তা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মাঝে সঞ্চারিত করার মাধ্যমে বাংলা নাটকের গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকরা।
পরিশেষে, আবদুল্লাহ আল মামুন কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ এবং তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তাঁর শিল্পদর্শন ও জীবনবোধ যে ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছে, তা বাংলা নাটকের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাঁর কর্মই প্রমাণ করে যে, প্রকৃত শিল্পীর কখনো মৃত্যু হয় না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির মাঝে, যা যুগ যুগ ধরে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাবে ভবিষ্যৎ শিল্পীদের।