ফিক্সিং, ডোপিং ও স্পোর্টস ল: প্রযুক্তির ফাঁদে অপরাধী, তবুও কেন অধরা?

ব্যারিস্টার সামির  avatar   
ব্যারিস্টার সামির
ফিক্সিং, ডোপিং ও স্পোর্টস ল: প্রযুক্তির ফাঁদে অপরাধী, তবুও কেন অধরা?
ফিক্সিং, ডোপিং ও স্পোর্টস ল: প্রযুক্তির ফাঁদে অপরাধী, তবুও কেন অধরা?
ছবি: সংগৃহীত

২০২৩ সালের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সন্দেহজনক গতিবিধি নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট ...

২০২৩ সালের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সন্দেহজনক গতিবিধি নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট (এসিইউ) যে তদন্ত শুরু করেছিল, তা আবারও ক্রীড়াঙ্গনে প্রযুক্তি-নির্ভর অপরাধ এবং এর প্রতিকারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তবে এই ঘটনা ক্রীড়াজগতে ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের মতো অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অগ্রগতি সত্ত্বেও অপরাধীদের অধরা থাকার প্রবণতাকে সামনে এনেছে। বিশ্বজুড়ে, ক্রীড়া বাজি বাজারের আকার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রিত বা অবৈধ বাজির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই বিশাল অর্থের হাতছানি ফিক্সিং চক্রকে আরও শক্তিশালী করছে এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও তাদের শনাক্তকরণ ও শাস্তির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার অপরাধীদের সনাক্তকরণের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রায়শই ডেটা অ্যাক্সেসের অভাবে ভোগে।

আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স, ক্রীড়া অপরাধ সনাক্তকরণে বিপ্লবী পরিবর্তন এনেছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ফেডারেশন ও জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলো এখন বাজি বাজারের প্যাটার্ন, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং ম্যাচের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করছে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি-ডোপিং এজেন্সি (WADA) তাদের অ্যান্টি-ডোপিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ADAMS) প্ল্যাটফর্মে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে অ্যাথলেটদের বায়োলজিক্যাল পাসপোর্ট ডেটা বিশ্লেষণ করে ডোপিংয়ের অস্বাভাবিক প্যাটার্ন চিহ্নিত করে। এটি প্রথাগত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু, অপরাধীরাও বসে নেই। তারা ডার্ক ওয়েব, ভিপিএন এবং ছদ্মবেশী অনলাইন পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এর বিকেন্দ্রীভূত প্রকৃতি এবং ছদ্মনামযুক্ত ঠিকানা ব্যবহারকারীদের পরিচয় গোপন রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে, যদিও অপরাধের সূত্রপাত এবং সম্ভাব্য জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে প্রযুক্তিগত সংকেত পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতে তা উপস্থাপন করা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সরকার ক্রীড়া আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও, ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার অপরাধ দমনে পর্যাপ্ত সক্ষমতার অভাব একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিকভাবে, ক্রীড়া আইন এবং বিচার ব্যবস্থায় ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের মতো অপরাধ দমনে একটি সমন্বিত পদ্ধতির অভাব রয়েছে। বিভিন্ন দেশের আইন ও বিধিমালা ভিন্ন হওয়ায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রগুলো প্রায়শই এই আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যায়। এশিয়া মহাদেশে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ করলেও, ক্রীড়া অপরাধ দমনে আঞ্চলিক আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণের ক্ষেত্রে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU) কনভেনশন অন দ্য ম্যানিপুলেশন অব স্পোর্টস কম্পিটিশনস (ম্যাচ ফিক্সিং কনভেনশন) এর মতো কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকলেও, এর বাস্তবায়ন এবং কার্যকারিতা দেশভেদে ভিন্ন। বাংলাদেশের মতো দেশগুলিতে, যেখানে ক্রীড়া আইন এখনও পুরোপুরি আধুনিকায়িত হয়নি, সেখানে ফিক্সিং বা ডোপিংয়ের ঘটনা প্রমাণিত হলেও, কঠোর শাস্তির বিধানের অভাবে অপরাধীরা প্রায়শই অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার ক্রীড়াঙ্গনে ফিরে আসে। এছাড়া, তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বাধীন বিচারিক ক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় সংস্থান নিশ্চিত না হলে, প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায় না। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যদিও সুশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অর্থায়ন করে, তবে ক্রীড়া খাতে সুনির্দিষ্টভাবে ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের বিরুদ্ধে আইনি সংস্কার ও প্রয়োগের জন্য সরাসরি অর্থায়ন বা কারিগরি সহায়তা তুলনামূলকভাবে কম।

সংস্থা/প্রতিষ্ঠান ২০২০-২০২২ সালে চিহ্নিত সন্দেহজনক ঘটনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাধানকৃত ঘটনার হার আইনি প্রক্রিয়ায় দণ্ডপ্রাপ্তির হার
আইসিসি (ক্রিকেট) ৪৭টি (ফিক্সিং সম্পর্কিত) ৪২% ১৫%
ডব্লিউএডিএ (ডোপিং) ১,৮১৭টি (নমুনা বিচ্যুতি) ৬২% (ADAMS ডেটা বিশ্লেষণ) ৩৮%
ইউয়েফা (ফুটবল) ১১৮টি (ম্যাচ ম্যানিপুলেশন) ৩০% ১০%
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বাংলাদেশ ৩টি (প্রাথমিক অভিযোগ) ০% ০%

উৎস: আইসিসি অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট রিপোর্ট, WADA বার্ষিক পরিসংখ্যান, UEFA ইনটিগ্রিটি রিপোর্ট, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে 'জাতীয় ক্রীড়া আইন, ২০১৮' (প্রস্তাবিত) এর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং এর মধ্যে ম্যাচ ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট, কঠোর এবং অ-জামিনযোগ্য শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করবে, যা ডিজিটাল প্রমাণকে আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো দেবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) যৌথভাবে একটি বিশেষায়িত 'ক্রীড়া সাইবার অপরাধ ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করবে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে ডিজিটাল ফরেনসিক এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ট্র্যাকিংয়ে প্রশিক্ষিত জনবল ও অত্যাধুনিক সফটওয়্যার দ্বারা সজ্জিত হবে। এই ইউনিট ডব্লিউএডিএ এবং আইসিসি'র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি প্রোটোকল তৈরি করবে।
  • ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এর সহায়তায় একটি 'আঞ্চলিক ক্রীড়া সততা তহবিল' (Regional Sports Integrity Fund) গঠন করা যেতে পারে, যা বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোকে ক্রীড়া অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা বিনিময়ে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার সামির

ব্যারিস্টার সামির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফিক্সিং, ডোপিং ও স্পোর্টস ল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator