গত ২৫শে এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক তার সর্বশেষ মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮.৫০ শতাংশে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চলমান প্রচেষ্টার একটি অংশ। এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো যখন দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে। লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকেই কঠিন করে তোলেনি, বরং মধ্যবিত্তেরও সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে হ্রাস করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সুদের হার বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, যেখানে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন যে কেবলমাত্র মুদ্রানীতির কড়াকড়ি দিয়ে সরবরাহ-জনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, যদি না কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর সমাধান করা হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির পেছনে যেমন বৈশ্বিক কারণ রয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও কম দায়ী নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। একই সাথে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন আমদানিকৃত পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। গত এক বছরে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে আমদানিকারকদের পণ্য খালাসে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে এবং এর চূড়ান্ত বোঝা পড়ছে ভোক্তার ওপর। এই পরিস্থিতি নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত নীতির অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান, যেখানে সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং বাজার তদারকির অপ্রতুলতা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আমদানি শুল্ক ও কর কাঠামোতে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা আনতে ব্যর্থ হওয়ায়, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে, ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতা শুধুমাত্র মূল্যস্ফীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর অধীনে পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতাও এই অর্থনৈতিক চাপের একটি প্রতিচ্ছবি, যেখানে বিনিয়োগকারীরা উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হারের কারণে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর তথ্য অনুযায়ী, পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্যের অভাব এবং প্রতিযোগিতার অক্ষমতা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, সরকারের ভর্তুকি নীতি ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে NBR-এর ব্যর্থতা বাজেট ঘাটতিকে বাড়িয়ে তুলেছে, যা পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন, যেখানে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
| অর্থবছর | বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি (CPI) | জিডিপি প্রবৃদ্ধি (%) | মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার (গড়) |
|---|---|---|---|
| ২০১৮-১৯ | ৫.৪৮% | ৭.৮৮% | ৮৪.৪০ |
| ২০১৯-২০ | ৫.৬৫% | ৩.৪৫% | ৮৪.৮৫ |
| ২০২০-২১ | ৫.৫৬% | ৬.৯৪% | ৮৪.৮০ |
| ২০২১-২২ | ৬.১৫% | ৭.১০% | ৮৬.৫০ |
| ২০২২-২৩ | ৯.০২% | ৫.৭৮% | ১০৩.৭৫ |
| ২০২৩-২৪ (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) | ৯.৬৭% | (প্রত্যাশিত) ৬.৫% | ১১০.০০ |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), আইএমএফ (প্রত্যাশিত ডেটা)
সুপারিশ
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বাজার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে 'বাজার নিয়ন্ত্রণ আইন' (Market Regulation Act) এর কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ ব্যাংককে আমদানি নীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ডলারের বিনিময় হারকে বাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে তুলতে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর 'বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা নীতি' প্রণয়ন করতে হবে।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে অতিরিক্ত শুল্ক ও কর হ্রাস করার জন্য একটি 'জরুরি রাজস্ব সংস্কার প্যাকেজ' ঘোষণা করতে হবে, যাতে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমে। একই সাথে, BSEC এর সঙ্গে সমন্বয় করে বিনিয়োগ সুরক্ষার জন্য পুঁজি বাজারে আস্থা ফেরাতে এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে 'পুঁজি বাজার স্থিতিশীলতা তহবিল' (Capital Market Stabilization Fund) এর কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সম্প্রসারিত করতে হবে।
- বাংলাদেশ ব্যাংককে মুদ্রানীতির পাশাপাশি ফিসকাল পলিসির সাথে সমন্বয় করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি 'সমন্বিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কাঠামো' (Integrated Economic Stability Framework) প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে, CPD এর সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা আবশ্যক, যা বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমাবে।