ফ্যাশন বর্জ্যে নতুন জীবন: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনী সমাধান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফ্যাশন বর্জ্যে নতুন জীবন: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনী সমাধান

নাবিলা পারভীন  avatar   
নাবিলা পারভীন
ফ্যাশন বর্জ্যে নতুন জীবন: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনী সমাধান
ফ্যাশন বর্জ্যে নতুন জীবন: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনী সমাধান
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA) এবং গ্লোবাল গ্রিন গ্রোথ ইনস্টিটিউট (GGGI) এর যৌথ উদ্যোগে 'সার্কুলার ইকোনমি ইন টেক্সটাইল অ্য...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA) এবং গ্লোবাল গ্রিন গ্রোথ ইনস্টিটিউট (GGGI) এর যৌথ উদ্যোগে 'সার্কুলার ইকোনমি ইন টেক্সটাইল অ্যান্ড গার্মেন্টস সেক্টর' শীর্ষক একটি সেমিনারে পোশাক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই সেমিনারে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প প্রতি বছর প্রায় ৫,৭০,০০০ টন টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপাদন করে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুনর্ব্যবহারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অব্যবহৃত থেকে যায়। এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করার চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা উভয়ই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশগত পদচিহ্ন হ্রাস করার ক্ষেত্রে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বিপ্লবী পরিবর্তন আনতে পারে।

পোশাক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি শুধু পরিবেশগত দায়বদ্ধতা নয়, বরং এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগও বটে। বর্তমানে, তৈরি পোশাক খাতের বর্জ্যগুলির মধ্যে প্রাক-ভোক্তা বর্জ্য (pre-consumer waste), যা মূলত কাটিং ফ্লোর থেকে উৎপন্ন হয়, তা প্রায় ৯০-৯৫% পুনর্ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু এর একটি ক্ষুদ্র অংশই উচ্চ-মূল্যের পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি অংশ হয় নিম্ন-মানের পণ্য তৈরিতে যাচ্ছে অথবা সরাসরি landfill-এ স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই অব্যবহৃত সম্পদের মূল কারণ হলো পর্যাপ্ত প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং একটি সমন্বিত বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার অভাব। তবে, সাম্প্রতিককালে কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা বর্জ্য থেকে তন্তু (fiber-to-fiber) পুনর্ব্যবহারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করছে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু কারখানা তাদের কাটিং ফ্লোর বর্জ্য সরাসরি স্পিনিং মিলে পাঠাচ্ছে, যা নতুন সুতা তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির উপর চাপ কমছে।

এই উদ্ভাবনী সমাধানের মাধ্যমে কেবল পরিবেশগত দূষণই কমানো যায় না, বরং রপ্তানি বহুমুখীকরণেও নতুন পথ তৈরি হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর তথ্য অনুযায়ী, টেকসই পোশাক পণ্যের আন্তর্জাতিক চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান থেকে উৎপাদিত পোশাক পণ্যের জন্য বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন বাজার উন্মোচন করছে। বিশেষ করে, উচ্চ-মূল্যের পুনর্ব্যবহারযোগ্য সুতা এবং কাপড় উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার রপ্তানি ঝুড়িতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BKMEA) এর সদস্যরাও এই বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছেন এবং তাদের অনেক সদস্যই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন। এটি একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে দেশের ব্র্যান্ড ইমেজকেও শক্তিশালী করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে 'মেড ইন বাংলাদেশ' ট্যাগকে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিশ্ব মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করবে।

বছর মোট টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপাদন (টন) পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্যের পরিমাণ (টন) পুনর্ব্যবহার হার (%) পুনর্ব্যবহার থেকে সম্ভাব্য রপ্তানি মূল্য (মিলিয়ন USD)
২০২০ ৫,০০,০০০ ৩০,০০০ ৬% ৫০
২০২১ ৫,৫০,০০০ ৪০,০০০ ৭.৩% ৭০
২০২২ ৫,৭০,০০০ ৫০,০০০ ৮.৮% ১০০
২০২৩ (প্রাক্কলিত) ৬,০০,০০০ ৭০,০০০ ১১.৭% ১৫০

উৎস: BGMEA, GGGI এবং EPB এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাক্কলিত।

সুপারিশ

  • সরকারকে দ্রুত 'সার্কুলার ইকোনমি অ্যাকশন প্ল্যান' চূড়ান্ত করে কার্যকর করতে হবে, যেখানে পোশাক শিল্পের বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং উচ্চ-মূল্যের পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগের জন্য সুস্পষ্ট নীতিগত নির্দেশনা থাকবে। বিশেষ করে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) এর মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে।
  • শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এর মাধ্যমে পোশাক কারখানাগুলিতে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য মানসম্মত গাইডলাইন ও নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারকারী কারখানাগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক এর মাধ্যমে সহজ শর্তে সবুজ অর্থায়ন (green financing) সুবিধা প্রদান করতে হবে।
  • BGMEA এবং BKMEA এর নেতৃত্বে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যার মূল কাজ হবে বর্জ্য সংগ্রহকারী, প্রক্রিয়াকরণকারী এবং শেষ ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন তৈরি করা। এই টাস্কফোর্সকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর সাথে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক বাজারে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য প্রচার এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা পারভীন

নাবিলা পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফ্যাশন, লাইফস্টাইল ও টেকসই পোশাক। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator