চাঁদপুর লঞ্চঘাটে মালামাল বহনের নামে যাত্রীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। গত কয়েকদিন আগে লঞ্চঘাটে এক যাত্রী তার সঙ্গে থাকা একটি ব্যাগ ও তুলার বস্তা নিয়ে প্রবেশের সময় কুলি বা শ্রমিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের বাধার সম্মুখীন হন। এ সময় ওই যাত্রীর কাছে মালামাল বহনের ফি বাবদ ১০০ টাকা দাবি করা হয়, যা সাধারণ যুক্তিতে অযৌক্তিক। যাত্রী এই অন্যায্য দাবির প্রতিবাদ করলে এবং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। জনবহুল এই নৌ-বন্দরে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন যাত্রীকে মারধরের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ঘাট এলাকায় এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে যাত্রী অধিকার বা নিরাপত্তার চেয়ে চাঁদাবাজির আধিপত্য বেশি শক্তিশালী। এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং বন্দর ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী যাত্রীসহ নিয়মিত যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, চাঁদপুর লঞ্চঘাটে মালামাল বহনকারী শ্রমিকদের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা সরকারি অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা নেই। শ্রমিকরা নিজেদের ইচ্ছামতো যাত্রীদের মালামালের ওপর ভিত্তি করে আকাশচুম্বী টাকা দাবি করে এবং তা না দিলে চরম দুর্ব্যবহার করে। ভুক্তভোগী যাত্রী জানান, তিনি ৫০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তাকে মারধর করা হয়, যা প্রমাণ করে যে এসব চক্রের মূল লক্ষ্য যাত্রীসেবা নয় বরং ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। লঞ্চঘাটে যাতায়াত করা সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেন, এখানে কোনো রসিদ বা নিয়মের বালাই নেই এবং প্রতিবাদ করলেই সংঘবদ্ধ চক্রের আক্রমণের শিকার হতে হয়। এই অব্যবস্থাপনার কারণে নারী ও বয়স্ক যাত্রীরা প্রতিনিয়ত চরম আতঙ্কে যাতায়াত করছেন, অথচ তাদের অভিযোগ শোনার মতো বা প্রতিকার দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ঘাটে দৃশ্যমান নেই।
লঞ্চঘাটে চলা এই নৈরাজ্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। লঞ্চ মালিক সমিতি এবং ঘাট ইজারাদারদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বা দায়বদ্ধতার স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি। সাধারণ যাত্রীদের দাবি, যদি মালামাল বহনের জন্য কোনো ফি নির্ধারিত থাকে, তবে তা বড় করে সাইনবোর্ডে টাঙিয়ে দিতে হবে এবং প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে রসিদ প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নৌ পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এই চক্রটি দিনের পর দিন তাদের দৌরাত্ম্য বাড়িয়ে চলেছে। কর্তৃপক্ষ যদি অবিলম্বে এই অসাধু শ্রমিক ও চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করে তাদের আইনের আওতায় না আনে, তবে ভবিষ্যতে এই ঘাটে যাতায়াত করা যাত্রীদের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন এবং হয়রানি বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক নজরদারি এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে, চাঁদপুর লঞ্চঘাটে যাত্রী হয়রানির এই ঘটনাটি দেশের পরিবহন খাতের সামগ্রিক বিশৃঙ্খলার একটি প্রতিচ্ছবি। সামান্য টাকার জন্য একজন যাত্রীকে মারধরের ঘটনা লঞ্চঘাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। যদি দ্রুত এই চাঁদাবাজি বন্ধ না করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ নৌপথের যাতায়াতে আগ্রহ হারাবে এবং লঞ্চঘাটে বিশৃঙ্খলা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। যাত্রী অধিকার নিশ্চিত করতে হলে কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব, যা পালনে ব্যর্থতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।