চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে আলোচিত গৃহবধূ জাহেদা আক্তার মিশু হত্যা মামলায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় মো. সুজন খান নামে এক আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। রোববার দুপুরে চাঁদপুরের জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ সামছুন্নাহার জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত সুজনকে ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে বিয়ের পর পারিবারিক কলহের জেরে স্বামী সোহেল বেপারী কাতার পাড়ি দিলে মিশুর সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরোধ চরমে পৌঁছায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই ভোরে মিশুর বাবার বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিনই মিশুর মা ছালেহা বেগম বাদী হয়ে পাঁচজনকে আসামি করে ফরিদগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
মামলার এজাহার ও তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গৃহবধূ মিশুর ওপর হামলার ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ঘটনার দিন সুজন খান মিশুর বাবার বাড়িতে প্রবেশ করে তার মাথা ও কানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম করেন। ভুক্তভোগীর মা ছালেহা বেগমের আর্তচিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে সুজন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মুমূর্ষু অবস্থায় মিশুকে প্রথমে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তৎকালীন উপপরিদর্শক উনুমং মায়মা দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর আদালতে পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত ২০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন, যেখানে আসামির অপরাধ স্বীকারোক্তি এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ সুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে অপর চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের খালাস প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত সুজন খান আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর কোহিনুর রশিদ রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র চুলচেরা বিশ্লেষণের পরই আদালত এই রায় দিয়েছেন। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় পুলিশের ভূমিকা এবং সাক্ষীদের সাহসী সাক্ষ্যদান ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে যে, পারিবারিক বিরোধের জেরে মিশুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং সুজন খান ব্যক্তিগতভাবে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে কাজ করেছেন। রায়ের পর ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হলেও, খালাস পাওয়া চার আসামির বিষয়ে আদালতের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি মহলে বিভিন্ন বিশ্লেষণ উঠে আসছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এই মামলার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এই রায়টি সমাজে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গৃহবধূ মিশু হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনাগুলো জনমনে যে ভীতির সঞ্চার করে, আদালত কর্তৃক কঠোর শাস্তির বিধান সেই আতঙ্ক নিরসনে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা রোধে বিচারিক প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। মিশু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার মাধ্যমে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আইনি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল, যা একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা থেকে কিছুটা মুক্তি দেবে এবং সমাজকে অপরাধের পরিণাম সম্পর্কে সচেতন করবে।