সম্প্রতি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো থেকে প্রতি বছর যে সংখ্যক শিক্ষার্থী সনদ লাভ করছেন, তার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই শিল্প-কারখানায় সরাসরি কর্মসংস্থান লাভে হিমশিম খাচ্ছেন। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পের চাহিদার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। দেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক কাঠামো এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যখন দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, তখন এই অসামঞ্জস্য ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এক বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ নতুন কর্মপ্রত্যাশী প্রবেশ করে, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দক্ষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। তবে, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং বিভিন্ন শিল্প খাতের জরিপ অনুসারে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি খুঁজে পেতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। বিশেষত, আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প যেমন অটোমেশন, রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স খাতে প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর তীব্র অভাব রয়েছে। এই অভাবের মূল কারণ হলো, প্রচলিত পাঠ্যক্রমগুলোতে প্রায়শই পুরানো প্রযুক্তি ও পদ্ধতি শেখানো হয়, যা বর্তমান শিল্পের দ্রুত পরিবর্তিত চাহিদা থেকে বহুলাংশে পিছিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, বহু পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এখনো এমন যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, যা শিল্পে এখন আর ব্যবহৃত হয় না, অথবা তার আধুনিক সংস্করণ এসেছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জন করলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আধুনিক শিল্প পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হয়।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের একটি বড় অংশের শিল্প অভিজ্ঞতা সীমিত। অনেক শিক্ষকই একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসায় আধুনিক শিল্পের চ্যালেঞ্জ ও চাহিদা সম্পর্কে তাদের বাস্তব ধারণা কম থাকে। এছাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক ল্যাব ও ওয়ার্কশপের অভাব একটি বড় সমস্যা। উন্নত দেশগুলোতে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ ব্যাপক হলেও, বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির অভাবে শিক্ষার্থীরা কেবল তত্ত্বীয় জ্ঞান নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকে। এই সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনে বাধা দেয় এবং তাদের শিল্পে যোগদানের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে ব্যর্থ হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিলেও, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং সমন্বয়হীনতা কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে বাধা সৃষ্টি করছে।
| খাত | শিল্পে দক্ষ কর্মীর চাহিদা পূরণ (২০২২-২৩) | কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সরবরাহ (২০২২-২৩) | চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান |
|---|---|---|---|
| পোশাক শিল্প ও বস্ত্র | ৮৫% | ৬৫% | ২০% |
| নির্মাণ শিল্প | ৭৮% | ৫০% | ২৮% |
| তথ্য প্রযুক্তি (IT) ও সফটওয়্যার | ৯০% | ৩০% | ৬০% |
| ইলেকট্রনিক্স ও অটোমোবাইল | ৮০% | ৩৫% | ৪৫% |
| পর্যটন ও আতিথেয়তা | ৭০% | ৪৫% | ২৫% |
উৎস: NSDA ও BANBEIS এর যৌথ জরিপ প্রতিবেদন, ২০২৩
সুপারিশ
- কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) যৌথভাবে প্রতি দুই বছর অন্তর শিল্প খাতের চাহিদা বিশ্লেষণ করে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করার জন্য একটি বাধ্যতামূলক নীতি প্রণয়ন করবে। এই প্রক্রিয়ায় শিল্প প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে, যা বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও সংশোধনে সরাসরি ভূমিকা পালন করবে।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য অত্যাধুনিক শিল্প প্রযুক্তির ওপর নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। এই প্রশিক্ষণে শিক্ষকদের কমপক্ষে ৩০% সময় শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ বা অন-দ্য-জব ট্রেনিং (OJT) এর মাধ্যমে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে ব্যয় করতে হবে। এক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং NSDA যৌথভাবে শিক্ষকদের জন্য ‘ইন্ডাস্ট্রি অ্যাটাচমেন্ট প্রোগ্রাম’ চালু করবে এবং এর কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করবে।
- সরকার পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের অধীনে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক ল্যাবরেটরি ও ওয়ার্কশপ স্থাপন করবে। বিশেষত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী প্রযুক্তি যেমন রোবোটিক্স, এআই, আইওটি এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ল্যাব স্থাপনে জোর দিতে হবে। এই উদ্যোগে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালার (National Skills Development Policy) আওতায় বাস্তবায়িত হবে।