ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনাল: খেলাপি ঋণ আদায়ে কতটা কার্যকর? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনাল: খেলাপি ঋণ আদায়ে কতটা কার্যকর?

অ্যাডভোকেট সাব্বির  avatar   
অ্যাডভোকেট সাব্বির
ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনাল: খেলাপি ঋণ আদায়ে কতটা কার্যকর?
ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনাল: খেলাপি ঋণ আদায়ে কতটা কার্যকর?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট বিতরণ করা...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৩.১১ শতাংশ। এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, খেলাপি ঋণ আদায়ে ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনাল (Debt Recovery Tribunal - DRT) কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যদিও ১৯৯০ সাল থেকে প্রণীত ও পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ঋণ আদালত আইন দ্বারা শক্তিশালী করা এই ট্রাইব্যুনালগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য গঠিত হয়েছিল, বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং কার্যকারিতা নিয়ে নিরন্তর আলোচনা চলছে। বিশেষ করে, সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে আদায়কৃত ঋণের পরিমাণ এবং মামলা নিষ্পত্তির ধীরগতি এই ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনালগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দ্রুততার সাথে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পাওনা আদায়ে সহায়তা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও মামলা জট এবং দীর্ঘসূত্রিতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM)-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হলো, ট্রাইব্যুনালগুলোর বিচারিক ক্ষমতা সীমিত থাকা এবং আপিলের একাধিক স্তর বিদ্যমান থাকা। অনেক ক্ষেত্রে, ঋণগ্রহীতারা মামলার দীর্ঘসূত্রিতাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে ঋণ পরিশোধ এড়িয়ে চলেন। উদাহরণস্বরূপ, একটি মামলার রায় হওয়ার পরও উচ্চ আদালতে আপিল এবং স্থগিতাদেশের কারণে চূড়ান্ত আদায় প্রক্রিয়া বছরের পর বছর আটকে থাকে। এই দীর্ঘসূত্রিতা একদিকে যেমন ব্যাংকের মূলধন আটকে রাখে, অন্যদিকে তেমনি নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা হ্রাস করে। এছাড়াও, অনেক সময় দেখা যায়, ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে, যা রায় বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করে।

খেলপি ঋণ আদায়ে ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জামানত না থাকা বা জামানতের মূল্য কমে যাওয়ায় রায় কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়াও, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে বিদ্যমান আইনের কিছু দুর্বলতা এবং বাস্তবায়নে শিথিলতা পরিলক্ষিত হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব বা অন্যান্য অনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেও ঋণ আদায় প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট, কারণ তাদের বৃহৎ খেলাপি ঋণ পোর্টফোলিও এবং আদায় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা প্রায়শই দেখা যায়। আইনি সীমাবদ্ধতা, যেমন- ট্রাইব্যুনালের ডিক্রি কার্যকর করার জন্য পৃথক জারি মামলা দায়েরের প্রয়োজন, যা আদায় প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। এই জটিলতাগুলো ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে বাধা দিচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বছর মোট খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা) মোট বিতরণকৃত ঋণের শতাংশ ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনালের মামলা নিষ্পত্তির হার (আনুমানিক)
২০২০ (ডিসেম্বর) ৯৪,৪৪০ ৭.৬৬% ১৫%
২০২১ (ডিসেম্বর) ১,০৩,২৭৪ ৭.৯৩% ১৪%
২০২২ (ডিসেম্বর) ১,২০,৬৪৮ ৮.১৬% ১২%
২০২৩ (ডিসেম্বর) ১,৪৫,৬৩৩ ১০.১১% ১১%
২০২৪ (মার্চ) ২,৫০,০০০+ ১৩.১১% ১০%

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, BIBM গবেষণা প্রতিবেদন (বিভিন্ন সময়কালের উপর ভিত্তি করে আনুমানিক)

সুপারিশ

  • ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর সংশোধন করে ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনালগুলোর বিচারিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং আপিলের স্তর কমানো। বিশেষ করে, ট্রাইব্যুনালের ডিক্রি কার্যকরের জন্য পৃথক জারি মামলা দায়েরের বিধান বাতিল করে রায় ঘোষণার পরপরই জামানতকৃত সম্পত্তি নিলামে তোলার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে প্রদান করা।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে যৌথভাবে একটি বিশেষ সেল গঠন করতে হবে, যা ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিতকরণ, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের সম্পত্তি ক্রোক করে ঋণ আদায়ে ট্রাইব্যুনালগুলোকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করবে। এতে ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা ৪২-এ বর্ণিত ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান কার্যকর হবে।
  • সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ সকল তফসিলি ব্যাংকের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে হবে এবং প্রতিটি ব্যাংকে একটি শক্তিশালী 'অ্যাসেট রিকভারি ইউনিট' (Asset Recovery Unit) গঠন করতে হবে। এই ইউনিটগুলোকে ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনালের সাথে নিবিড় সমন্বয় করে কাজ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করবে, যাতে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে রায় কার্যকর করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গতিশীলতা আসে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট সাব্বির

অ্যাডভোকেট সাব্বির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator