সুন্দরবনের গহীন শেলা নদীতে মাছের পোনা সংগ্রহের সময় কুমিরের অতর্কিত আক্রমণে সেলিনা বেগম নামের এক নারী জেলের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার ১৭ জুন বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আওতাধীন শেলা নদীর লঞ্চঘাট এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। পঞ্চাশোর্ধ সেলিনা বেগম মোংলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল শেখের স্ত্রী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় তিনি আরও দুই নারী সঙ্গীর সাথে নদীতে জাল টেনে মাছের পোনা ধরছিলেন। আকস্মিকভাবে একটি কুমির তাকে আক্রমণ করে পানির গভীরে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বনবিভাগের পক্ষ থেকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানানো হয়েছে যে, কুমিরের হিংস্র থাবায় গুরুতর জখম হওয়ার ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। মূলত জীবিকার তাগিদে বন ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি নিয়ে মাছ শিকার করতে গিয়েই এই প্রাণহানির ঘটনাটি ঘটেছে।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
ভুক্তভোগী সেলিনা বেগমের সাথে থাকা অপর দুই নারী জেলে জানিয়েছেন, কুমিরটি যখন সেলিনাকে পানির নিচে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা জালের লাঠি দিয়ে প্রাণপণ লড়াই করেছেন। তাদের সাহসী প্রচেষ্টায় একপর্যায়ে কুমিরটি সেলিনাকে ছেড়ে দিলেও ততক্ষণে তার প্রাণহানি ঘটে। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, সুন্দরবনের নদীগুলোতে কুমিরের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও বনবিভাগের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা বা নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করা হয় না। এছাড়া বন আইন অমান্য করে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছের পোনা শিকারের প্রবণতা বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। ভুক্তভোগী জেলেদের দাবি, বিকল্প কর্মসংস্থান বা সচেতনতামূলক প্রচারণার অভাবে দরিদ্র জেলেরা বাধ্য হয়েই বাঘ ও কুমিরের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাছ ধরতে যান, যা দিন দিন তাদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের স্টেশন কর্মকর্তা মো. হামিদুর রহমান জানান, জেলেরা অনুমতি ছাড়াই নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে মাছ শিকার করছিলেন, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তিনি দাবি করেন, বনবিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত টহল জোরদার করা হলেও বিশাল আয়তনের সুন্দরবনের প্রতিটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা প্রায় অসম্ভব। বন বিভাগের কর্মকর্তারা দায়সারা বক্তব্য প্রদান করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, বনরক্ষীদের কঠোর নজরদারি থাকলে এবং নিষিদ্ধ সময়ে পোনা শিকার রোধ করা গেলে এমন অকাল মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিহত জেলের মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে কুমিরের আক্রমণ থেকে জেলেদের সুরক্ষায় বনবিভাগ নতুন কোনো পরিকল্পনা বা নিরাপত্তা নীতিমালা গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রবল সংশয় দেখা দিয়েছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চলের মৎস্যজীবী ও বনজীবীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি আবারো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও জালের মাধ্যমে মাছের পোনা শিকারের মতো অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। যদি বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে জেলেদের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করতে না পারে এবং নদীগুলোতে কুমিরের বিচরণ ক্ষেত্র সম্পর্কে সঠিক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের মর্মান্তিক প্রাণহানির সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এখন স্থানীয় জনপদের প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।