শনিবার সন্ধ্যায় সুন্দরবনের শিবসা নদী সংলগ্ন শিংয়ের নালা নামক স্থানে ভারতগামী পাঁচটি কার্গো জাহাজের ওপর সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা থেকে মোংলা বন্দর হয়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদ-নদী পাড়ি দিয়ে ভারতে ফ্লাইঅ্যাশ আনতে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর অতর্কিত এই হামলা চালানো হয়। বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রোটকলের অধীনে চলাচলকারী এই নৌযানগুলোর মধ্যে চারটি জাহাজ দ্রুতগতিতে সরে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হলেও, সবার পেছনে থাকা এমভি আবদুল হাকিম-১ জাহাজটি ডাকাত দলের কবলে পড়ে। লাইফ জ্যাকেট পরিহিত প্রায় ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল ট্রলারযোগে এসে জাহাজটিতে উঠে পড়ে এবং স্টাফদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ব্যাপক লুটপাট চালায়। ডাকাতেরা জাহাজের মাস্টার ব্রিজে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়ে শটগান দিয়ে ১৫ থেকে ২০টি গুলি বর্ষণ করে, যা নৌপথে পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
ভুক্তভোগী জাহাজটির মাস্টার নুর নবীর ভাষ্যমতে, ডাকাতেরা জাহাজে উঠেই কর্মরত স্টাফদের মারধর করে এবং তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলে। প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী এই তাণ্ডবে ডাকাতেরা স্টাফদের ব্যক্তিগত মুঠোফোন, নগদ টাকা এবং জাহাজের মূল্যবান সরঞ্জামাদি লুট করে নিয়ে যায়। মাস্টার ব্রিজের গেট বন্ধ থাকায় ডাকাতেরা ভেতরে ঢুকতে না পারলেও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ভারত-বাংলাদেশ নৌ প্রোটকল কমিটির কার্যকরী সভাপতি সিরাজুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজগুলো মোংলা থেকে রওনা হওয়ার পর শেখবাড়িয়া থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার দূরত্বে পৌঁছালে এই হামলার শিকার হয়। শ্রমিকদের দাবি, সুন্দরবনের দুর্গম নদ-নদীগুলোতে নিয়মিত টহলের অভাব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার শিথিলতাকে কাজে লাগিয়েই অপরাধী চক্রগুলো বারবার নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে, যা পেশাদার নাবিক ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও স্থানীয় থানা-পুলিশ কিংবা কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আংটিহারা নৌ পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ ফারুখ হোসেন কেবল বিষয়টি শুনেছেন বলে দাবি করলেও কোনো অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন, যা প্রশাসনিক গাফিলতিরই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, নৌযান শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল এই রুটে যদি নিয়মিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হয়, তবে ভারত-বাংলাদেশ নৌ প্রোটকলের আওতায় জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বারবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবনের মতো সংরক্ষিত ও সংবেদনশীল নৌপথে এ ধরনের সশস্ত্র হামলা কেবল পণ্য পরিবহনেই বিঘ্ন ঘটাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই রুটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। নিয়মিত টহল ও নজরদারির অভাবে যদি এই রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা দেশের অর্থনীতি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রশাসনের দায়সারা মনোভাব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতা থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অবিলম্বে সুন্দরবন রুটে কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের নিয়মিত টহল জোরদার এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল এই রুটের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।