১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ থানার কোষারানিগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়েন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সালাহউদ্দিন। দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের এই মেধাবী শিক্ষার্থী দেশমাতৃকার টানে ভারতের পানিঘাট প্রশিক্ষণ শিবির থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন। জাবরহাট হাইডআউটে অবস্থানকালে নিজের বাবাকে উদ্ধারের মিথ্যা সংবাদের প্রলোভনে বাড়ি ফিরে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর ঘেরাওয়ের কবলে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের কান্নাকাটি ও মা পবিত্র কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে জীবন ভিক্ষা চাইলেও পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতার কাছে তা কোনো গুরুত্ব পায়নি। দেশদ্রোহী রাজাকারদের সহায়তায় সেদিনই তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঠাকুরগাঁও সদর সেনাছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়, যা ছিল তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের এক করুণ ও বীরত্বপূর্ণ সূচনালগ্ন।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
বন্দিশালায় সালাহউদ্দিনের ওপর চালানো হয় ইতিহাসের জঘন্যতম শারীরিক নির্যাতন। পাকিস্তানি বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল তাঁর কাছ থেকে মুক্তিবাহিনীর গোপন অবস্থান, যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং সহযোদ্ধাদের তালিকা উদ্ধার করা। প্রতিটি আঘাতের পর তাঁর নীরবতা হানাদারদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। ভুক্তভোগী সালাহউদ্দিনের সেই অটল দৃঢ়তা ছিল বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। মা ও পরিবারের মায়া কাটিয়ে তিনি দেশপ্রেমকে শ্রেষ্ঠ স্থান দিয়েছিলেন। নির্যাতনকারী পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন ও তার অনুচররা জানত যে, সালাহউদ্দিনের মুখ থেকে একটি শব্দ বের করতে পারলেই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় দলকে ধ্বংস করতে পারবে। কিন্তু অসহনীয় যন্ত্রণার মুখেও তিনি ছিলেন অবিচল, যা প্রমাণ করে যে দেশের স্বাধীনতার চেয়ে নিজের জীবনের কোনো মূল্য তাঁর কাছে ছিল না।
নির্যাতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে জনসমক্ষে নিয়ে আসে এবং শেষবারের মতো তথ্য প্রকাশের প্রলোভন দেখায়। জীবন বাঁচাতে তথ্যের বিনিময়ে মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হলেও সালাহউদ্দিন ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এই নীরবতা ছিল তাঁর সাহসের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এরপরই হায়েনার মতো পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ক্ষুধার্ত দুটি চিতাবাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করে। পৈশাচিক সেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে তিনি শহীদ হন। তাঁর এই আত্মত্যাগ কোনো সাধারণ মৃত্যু ছিল না, বরং এটি ছিল চরম দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির। হানাদার বাহিনী তাঁর শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করতে পারলেও তাঁর অকুতোভয় চেতনাকে বিন্দুমাত্র পরাস্ত করতে পারেনি, যা আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে।
সালাহউদ্দিনের এই আত্মত্যাগ বর্তমান প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেমের এক অমোঘ শিক্ষা হিসেবে বেঁচে থাকবে। তাঁর জীবন বিসর্জন কেবল একটি ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়, বরং এটি স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি। ঠাকুরগাঁওয়ের এই বীর সন্তানের বীরত্বগাথা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে অসংখ্য সালাহউদ্দিনের রক্ত ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। জাতীয় পর্যায়ে এই বীরের সঠিক মূল্যায়ন এবং তাঁর স্মৃতির যথাযথ সংরক্ষণ আগামী প্রজন্মের জন্য স্বাধীনতার চেতনাকে আরও শাণিত করবে। শহিদ সালাহউদ্দিনের এই মহান আত্মদান চিরকাল বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং দেশপ্রেমের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।