সাবিনা ইয়াসমিন—যে নাম আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন। তবে অনেকে জানেন না, তার গাওয়া প্রথম রেকর্ডিংই হয়ে গিয়েছিল ইতিহাসের অংশ। সেই গান আর কিছুই নয়, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা”।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
সাবিনা ইয়াসমিনের প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। যদিও বিভিন্ন সূত্রে ছবিটির পরিচালক হিসেবে জহির রায়হানের নাম উল্লেখ করা হয়, বাস্তবে পরিচালনা করেছিলেন আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চু। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই প্লেব্যাক যাত্রায়ও জহির রায়হানের ছায়া থেকে যায়।
তার আগে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে সমবেত কণ্ঠে সাবিনা ইয়াসমিন গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি “আমার সোনার বাংলা”। তিনি জানতেন না এটি চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হবে। অথচ সেটিই ছিল তার প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ডিং।
এই গানটিরই প্রথম দশ চরণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত হিসেবে গাওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে এটিকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়—যেখানে সাবিনা ইয়াসমিনের প্রথম রেকর্ডকৃত গানই হয়ে যায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—সাবিনা ইয়াসমিনের প্লেব্যাক যাত্রায় কেন বারবার জহির রায়হানের নাম উঠে আসে? আসলে সেই সময় জহির রায়হান অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন, কিন্তু সবক্ষেত্রে নিজের নাম ব্যবহার করতেন না। ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রের গানগুলোর তত্ত্বাবধানও করেছিলেন তিনি। তাই সাবিনা ইয়াসমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তার প্রথম প্লেব্যাকের পেছনে মূল কারিগর ছিলেন জহির রায়হান।
নিজের প্রথম প্লেব্যাকের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আলতাফ মাহমুদের হাত ধরেই তার পথচলা শুরু হয়েছিল। আলতাফ মাহমুদের বাসা ছিল তাদের পাশেই। তিনি সাবিনার মাকে রাজি করান ছোটদের গান থেকে বের হয়ে চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য। প্রথম গানটি রেকর্ড হওয়ার পর দীর্ঘ দেড় মাস কোনো খবর পাননি সাবিনা ইয়াসমিন। পরে আলতাফ মাহমুদ এসে জানান, গানটি জহির রায়হান শুনেছেন এবং ভীষণ প্রশংসা করেছেন। সেই প্রশংসাই তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং পথচলায় নতুন আলো জ্বালায়।
এরপর থেকে তিনি জহির রায়হানের নির্মিত বা তত্ত্বাবধান করা একাধিক চলচ্চিত্রে গান করেন। ধীরে ধীরে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল প্লেব্যাক শিল্পীতে পরিণত হন।
আজ যখন জাতীয় সংগীত বাজে, কোটি মানুষের সঙ্গে সাবিনা ইয়াসমিনও গর্বভরে স্মরণ করেন—কিভাবে তার জীবনের প্রথম রেকর্ডকৃত গান হয়ে গেছে একটি জাতির পরিচয়ের প্রতীক। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এ এক অনন্য কীর্তি, যা বাংলা সংগীতজগতকে করেছে আরও গৌরবান্বিত।