সালাউদ্দিন আকবর
ফেব্রুয়ারির এক মোলায়েম দুপুরে আলমারির একেবারে পেছনের তাকে হাত বাড়াতে গিয়ে যেন সময়ের গোপন দরজায় আঙুল ছুঁয়ে ফেললাম। ধুলোমাখা কিছু কাপড়ের নিচে লুকিয়ে ছিল এক টুকরো নীল ইতিহাস। আমার নব্বই দশকের সেই প্রিয় জিন্স।
জিন্সটা হাতে তুলে নিতেই মনে হলো, কাপড় নয়, যেন বাবার হাতের স্পর্শ ছুঁয়ে দেখছি। বছরের পর বছর ওটা আলমারির অন্ধকারে পড়ে ছিল, অথচ আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে।
মনে পড়ে, মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরোনোর সেই দিনটার কথা। ভালো ফলের আনন্দ তখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করিনি, তার আগেই বুকের ভেতর জন্ম নিয়েছিল এক কিশোর স্বপ্ন। বাবাকে বলেছিলাম, "একটা জিন্স প্যান্ট কিনে দেবে?"
আজকের ছেলেমেয়েদের কাছে বিষয়টি খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু তখন জিন্স ছিল শুধু পোশাক নয়, এক ধরনের স্বপ্ন, এক ধরনের আধুনিকতার প্রতীক। বাবা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিলেন। সেই হাসির ভেতরে ছিল সন্তানের ছোট্ট ইচ্ছেটুকু পূরণ করার নির্ভরতার আশ্বাস।
সেদিন আমরা গিয়েছিলাম পীর-ইয়ামেনী মার্কেটে। সরু গলি, ভিড় আর রঙিন পোশাকের সারির মধ্যে বাবা ধৈর্য ধরে একের পর এক জিন্স দেখছিলেন। অবশেষে একটি গাঢ় নীল জিন্স তাঁর পছন্দ হলো। ট্রায়াল রুম থেকে পরে বেরিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা হঠাৎ একটু বড় হয়ে গেছে।
কিন্তু আজ বুঝি, সেদিন আয়নায় যে ছেলেটিকে এত সুন্দর লাগছিল, তার সৌন্দর্য জিন্সে ছিল না; ছিল বাবার গর্বিত চোখে।
জিন্সটা কেনার পর বাবা কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, "সাবধানে পরবি, সামনে তোকে অনেক পথ হাঁটতে হবে।"
তখন বুঝিনি, কথাটা শুধু পোশাক নিয়ে বলা নয়। একজন বাবা তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎকে আশীর্বাদ করে দিয়েছিলেন কয়েকটি সাধারণ শব্দের ভেতর।
তারপর সত্যিই অনেক পথ হেঁটেছি।
কলেজের করিডোর, বন্ধুদের আড্ডা, বৃষ্টিভেজা বিকেল, প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ, প্রথম আত্মবিশ্বাস, প্রথম বড় হয়ে ওঠা। সবকিছুর সঙ্গী ছিল সেই নীল জিন্স। আর অদৃশ্যভাবে সঙ্গে ছিলেন বাবা।
সময়ের নিয়মে ফ্যাশন বদলেছে, মানুষ বদলেছে, জীবন বদলেছে। নতুন নতুন পোশাক আলমারি দখল করেছে। একসময় পীর-ইয়ামেনী মার্কেটের সেই নীল সঙ্গীটিও নির্বাসিত হয়েছে আলমারির অন্ধকার কোণে।
আজ আমরা দুজনই বুড়িয়ে গেছি।
জিন্সের রঙ ফিকে হয়েছে, আর বাবার চুলে নেমেছে সময়ের রূপালি ধুলো। জীবন আমাদের অনেক দূরে নিয়ে গেছে, তবুও সেই নীল কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে আজও লেগে আছে এক বাবার অকৃত্রিম ভালোবাসা।
হয়তো এখন জিন্সটা আমার কোমরে আর আগের মতো মানাবে না। হয়তো ফ্যাশনের মাপকাঠিতে ও অনেক পুরোনো। কিন্তু স্মৃতির কোনো ফ্যাশন নেই, ভালোবাসারও কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ নেই।
তাই আজ খুব ইচ্ছে করছে আবার ওটা পরি। স্টাইল দেখানোর জন্য নয়, বরং বাবার সেই হাতের উষ্ণতা আর কিশোর বয়সের সেই নির্ভেজাল আনন্দটুকু আরেকবার অনুভব করার জন্য।
আজ কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই।
আমি শুধু হাঁটতে চাই।
নীল জিন্সের পকেটে হাত রেখে, স্মৃতির পথ ধরে, বাবার সেই পুরোনো আশীর্বাদকে সঙ্গী করে।
যে আশীর্বাদ একদিন বলেছিল,
"অনেক পথ হাঁটতে হবে তোকে..."
আর সত্যিই, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পথগুলো আজও আমি বাবার হাত ধরেই হেঁটে চলেছি।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
লেখক ,কবি ও সাহিত্যিক
ঢাকা
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।