খুলনা সিএসএস আভা সেন্টারে সোমবার আয়োজিত আঞ্চলিক বিপণন কর্মশালায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম. এম. আরিফ পাশা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দেশের কৃষি খাতের আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টিপ্রিনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ বা পার্টনার প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি বিপণন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরি। মহাপরিচালক তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দেশের ৪৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জীবিকা কৃষিনির্ভর হওয়া সত্ত্বেও সনাতন পদ্ধতির কারণে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। কর্মশালাটি খুলনা কৃষি বিপণন কার্যালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কৃষি উদ্যোক্তা এবং আড়তদাররা অংশগ্রহণ করেন।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
কর্মশালায় উপস্থিত কৃষি উদ্যোক্তা এবং মাঠপর্যায়ের অংশীজনরা তাদের অভিজ্ঞতা ও বিপণন সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। মুক্ত আলোচনায় উঠে আসে যে, উৎপাদন বাড়লেও সঠিক বিপণন অবকাঠামো এবং বাজারজাতকরণে তথ্যপ্রযুক্তির অভাব উদ্যোক্তাদের বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা পণ্য বিক্রির ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং কোল্ড চেইন বা হিমায়িত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানান। পার্টনার প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার তৌহিদ মো: রাশেদ খান ও সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সুমন হোসাইন প্রবন্ধ উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি তুলে ধরেন। তারা জানান, প্রকল্পটি সারাদেশে ২০ হাজার উদ্যোক্তাকে অন-দ্য-জব প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ছয় হাজার পাঁচশত ৭৫ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। এই উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিন হাজার আটশত ১৫ জন নারী এবং দুই হাজার সাতশত ৬০ জন পুরুষ অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, এই প্রকল্পটি দেশের আটটি বিভাগ ও ৬৪টি জেলার ২০৮টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে যাতে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকরা সরাসরি ইনকিউবেশন সাপোর্ট ও কারিগরি সহায়তা পায়। কর্মশালায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো: রফিকুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজ সিফাত মেহনাজসহ প্রকল্পের এজেন্সি ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আব্দুলাহ আল ফারুক উপস্থিত থেকে মাঠপর্যায়ের সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের কথা জানান। বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, কেবল প্রশিক্ষণ প্রদানই যথেষ্ট নয়, বরং আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সাথে উদ্যোক্তাদের সংযোগ স্থাপনে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পারস্পরিক সহযোগিতায় এই বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকরা তাদের পণ্যের প্রকৃত দাম নিশ্চিত করতে পারেন।
পরিশেষে, এই কর্মশালাটি কৃষি খাতের ডিজিটাল রূপান্তর এবং উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদী সফলতা নির্ভর করছে প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং আধুনিক বিপণন অবকাঠামো নিশ্চিত করার ওপর। যদি প্রকল্পের আওতায় গৃহীত প্রশিক্ষণগুলো মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল স্থানীয় কৃষি পণ্যের বাজারকেই স্থিতিশীল করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারি সহায়তার এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারের কঠোর মানদণ্ড পূরণ করে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।