বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ধীরগতির কারণে ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তি ছিল সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। এই বাস্তবতায় ‘কমার্শিয়াল কোর্ট অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশে ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ও বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
অধ্যাদেশের ৩ নম্বর ধারায় সারা দেশে ধাপে ধাপে কমার্শিয়াল কোর্ট প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এসব আদালতের ভৌগোলিক এখতিয়ার নির্ধারণ করা হবে সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে। বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজদের মধ্য থেকে, যেখানে বাণিজ্যিক আইন বিষয়ে দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একইসঙ্গে, হাইকোর্ট বিভাগে কমার্শিয়াল আপিল বেঞ্চ গঠনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ আপিল কাঠামো নিশ্চিত করা হয়েছে।
অধ্যাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিস্তৃত সংজ্ঞা কাঠামো। ২(ঘ) ধারায় ২৩টিরও বেশি ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধকে এর আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন, বিনিয়োগ ও সাবস্ক্রিপশন চুক্তি, যৌথ উদ্যোগ, বীমা, মেধাস্বত্ব, এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের চুক্তি সংক্রান্ত বিরোধ। ফলে, প্রচলিত দেওয়ানি আদালতের ওপর চাপ কমিয়ে একটি লক্ষ্যভিত্তিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সময়সীমা নির্ধারণ। চূড়ান্ত শুনানির তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, যা দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন। পাশাপাশি, সর্বোচ্চ তিনবার মুলতবি, বাধ্যতামূলক প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখিত বক্তব্য দাখিল, এবং কেস ম্যানেজমেন্ট হিয়ারিংয়ের মতো আধুনিক বিচারিক পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই সংস্কারগুলো দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে ব্যবসায়িক আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অতীতে, মামলার দীর্ঘ সময়কাল বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ “Foreign Direct Investment (FDI)” এবং বড় অঙ্কের দেশীয় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করত। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা ব্যয়বহুল সালিশি পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতেন, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর ছিল না। নতুন এই অধ্যাদেশ সেই বাধাগুলো দূর করার একটি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। বিচারকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। এছাড়া, দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে এই আদালতের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, চলমান মামলাগুলোর স্থানান্তর এবং দেওয়ানি আদালতের সাথে সমন্বয় একটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। একইসঙ্গে, স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের পথে এই অধ্যাদেশ একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
সার্বিকভাবে, ‘কমার্শিয়াল কোর্ট অধ্যাদেশ ২০২৬’ শুধু একটি নতুন আইন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং আধুনিক বিচার ব্যবস্থার দিকে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়—এর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়।
লেখক : আকিব হাসান সাদ,
সম্পাদক,
ডেইলি আওয়ার নিউজ - ‘ডন’
গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক,
এক্সেস টু হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল - আহরি
Daily Our News - DON [ Your Daily News Bank ]



















