কেন আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য এই যুদ্ধ এক মরণফাঁদ?

আব্দুল্লাহ আল মামুন avatar   
আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মেজর গৌরব আর্যের মতে, ইরানের এই যুদ্ধ কৌশলের মূল কারিগর আইআরজিসি-র সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জাফরি।..

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত এখন এক নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে। পশ্চিমা শক্তির ধারণা ছিল শক্তিশালী বিমান হামলার মাধ্যমে দ্রুত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন (Regime Change) ঘটানো সম্ভব হবে, কিন্তু ইরানের দীর্ঘ ৩০ বছরের গোপন সামরিক পরিকল্পনা ‘মোজাইক ডকট্রিন’ (Mosaic Doctrine) সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মেজর গৌরব আর্যের মতে, ইরানের এই যুদ্ধ কৌশলের মূল কারিগর আইআরজিসি-র সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জাফরি। তিনি ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বা লিবিয়ার গাদ্দাফির পতন থেকে শিক্ষা নিয়ে এই বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।

এই ডকট্রিনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল: পুরো ইরানকে ৩১টি স্বাধীন সামরিক জোনে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি জোন বা ‘নোড’ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

  • স্বাধীন কমান্ড: এক অঞ্চলের কমান্ডারের কাছে অন্য অঞ্চলের খবর থাকে না। ফলে শীর্ষ নেতৃত্ব বা কেন্দ্রীয় সদরদপ্তর ধ্বংস হলেও যুদ্ধ থেমে যায় না।

  • নিজস্ব রসদ: প্রতিটি জোনের কাছে নিজস্ব ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল এবং পাহাড়ের নিচে সুরক্ষিত অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে।

এই যুদ্ধের ধরন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, আমেরিকা বা ইসরায়েল যদি জয়ীও হয়, তাকে বলা হবে ‘পিরিক ভিক্টরি’ (Pyrrhic Victory)। এটি এমন এক জয়, যেখানে বিজয়ী পক্ষকে এত বিশাল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় যে সেই জয়ের কোনো সার্থকতা থাকে না। পেন্টাগনের আশঙ্কা, এই সংঘাত অদূর ভবিষ্যতে শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং ওয়াশিংটন একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে পড়ছে।

যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘স্ট্রেট অফ হরমোজ’ বা হরমোজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের সতর্কতা অনুযায়ী, এই সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আজ পর্যন্ত ৪৭৫টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমবারের মতো ২,৫০০ মার্কিন মেরিন সেনা ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ জাহাজে করে ওকিনাওয়া বন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ইরানের ভূখণ্ডের নির্দিষ্ট কোনো অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।

পরিশেষে, ইরানের এই ‘মোজাইক ডকট্রিন’ আধুনিক বিশ্বকে এটিই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, কেবল প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেই একটি জাতিকে দ্রুত হারানো সম্ভব নয়। এই যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সামরিক স্থিতিশীলতা তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

No comments found


News Card Generator