দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, বিশ্ব অর্থনীতিতে নজিরবিহীন ধস এবং পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকির পর অবশেষে আলোচনার টেবিলে বসেছে দুই চিরবৈরী রাষ্ট্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টারে শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক শান্তি বৈঠককে ঘিরে এখন পুরো বিশ্বের নজর। একদিকে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) এবং হরমোজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত তাণ্ডব এবং চীনা সামরিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ, সব মিলিয়ে এক অত্যন্ত জটিল ও সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব রাজনীতি।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
শনিবার সকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধিদল এই হাইভোল্টেজ বৈঠকে অংশ নিচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের মধ্যস্থতায় এই বৈঠকে মূলত সাতটি প্রধান অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে:
-
লেবানন সংকট: লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
-
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়া।
-
হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: এই জলপথের ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ‘টোল’ আদায়ের অধিকার।
-
পারমাণবিক কর্মসূচি: ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী শর্ত।
-
জব্দকৃত অর্থ: আমেরিকার ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলার (৬ বিলিয়ন) ফেরত দেওয়া।
-
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি: মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার।
-
আঞ্চলিক নিরাপত্তা: ইসরায়েলি অভিযানের পরিধি সীমিত করার গ্যারান্টি।
সাবেক গুগল কর্মকর্তা বিলাওয়াল সিধু এবং সাংবাদিক রবীশ কুমারের বিশ্লেষণে হরমোজ প্রণালীর এক নতুন চিত্র উঠে এসেছে। ইরান দাবি করেছে যে, হরমোজ প্রণালী কোনো আন্তর্জাতিক জলপথ নয়, বরং এটি ইরান ও ওমানের সমুদ্রসীমার অংশ।
-
নতুন রুট: ইরান একটি নতুন নৌ-মানচিত্র প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, ওমানের উপকূলীয় অঞ্চল বর্তমানে ‘সি মাইন’ (Sea Mines) বা সমুদ্র-বোমার কারণে অনিরাপদ। ফলে সব বাণিজ্যিক জাহাজকে এখন ইরানের উপকূল ঘেঁষে নতুন একটি সরু পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হবে।
-
আর্থিক সুবিধা: এই নতুন রুটে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজ থেকে ইরান ব্যারেল প্রতি ১-২ ডলার বা জাহাজ প্রতি ২-৩ মিলিয়ন ডলার ‘এসকর্ট ফি’ বা টোল আদায় করছে। জেপি মরগানের রিপোর্ট অনুযায়ী, এর ফলে ইরানের বার্ষিক আয় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা সৌদি আরবের আয়ের সমান।
শান্তি আলোচনা চললেও লেবাননে যুদ্ধের তীব্রতা কমেনি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান-মার্কিন চুক্তি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী লেবাননের বৈরুতসহ ১০০টিরও বেশি স্থানে মাত্র ১০ মিনিটে ১৬০টি বোমা বর্ষণ করেছে। এই হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আল জাজিরার সাংবাদিক মোহাম্মদ উইশাহ-ও এই আগ্রাসনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, লেবাননে গণহত্যা বন্ধ না হলে তারা যেকোনো সময় ইসলামাবাদ বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসবে।
সমর বিশেষজ্ঞ মেজর গৌরব আর্য এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, চীন পাকিস্তানের ভূখণ্ড (গওয়াদর ও সিপেক করিডোর) ব্যবহার করে ইরানে অত্যাধুনিক মিসাইল ও এআই (AI) চালিত ড্রোন সরবরাহ করছে। ট্রাম্পের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল মাইক ফ্লিন একে ‘এক্ট অফ ওয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। চীনা ‘বেইদু’ (Beidou) নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করে ইরান মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বর্গমিটারের এক-তৃতীয়াংশ নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে, যা পেন্টাগনকে চরম দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আগুন লেগেছে। যদিও যুদ্ধবিরতির খবরের পর তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৫ ডলারে নেমেছে, তবে সংকট কাটেনি।
-
বাংলাদেশ: জ্বালানি সাশ্রয় করতে বাংলাদেশ সরকার দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।
-
আঞ্চলিক মজুত: পাকিস্তানে মাত্র ১০ দিন এবং ভারতে ২২ দিনের তেলের মজুত অবশিষ্ট রয়েছে। মিশর ও ফিলিপাইনে জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে।
ইরান এই যুদ্ধে তাদের সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে তুলতে ব্যাপক প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।
-
মিনাব ১৬৮: ইরান তাদের শান্তি আলোচনার প্রতিনিধিদলের নাম রেখেছে ‘মিনাব ১৬৮’, যা মার্কিন হামলায় নিহত ১৬৮ জন স্কুল শিক্ষার্থীর স্মরণে।
-
অবকাঠামো মেরামত: মার্কিন হামলায় ধ্বংস হওয়া রেলওয়ে ব্রিজ মাত্র ৪০ ঘণ্টার মধ্যে মেরামত করে ইরান তাদের কারিগরি শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করেছে।
-
সাংস্কৃতিক প্রচার: তেহরানের আধুনিক মেট্রো স্টেশন ও গির্জার ছবি দেখিয়ে ইরান প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা একটি প্রগতিশীল ও সহনশীল রাষ্ট্র।
বিশ্বজুড়ে এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘চীনের নস্ট্রাদামাস’ খ্যাত প্রফেসর জিয়াং-এর একটি মন্তব্য। জিয়াং ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এই যুদ্ধের এক পর্যায়ে আল-আকসা মসজিদ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। যদিও এটি অনুমাননির্ভর, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় এই মন্তব্যটি ব্যাপক উত্তজনা সৃষ্টি করেছে।
ইসলামাবাদের এই বৈঠক কি আসলেই স্থায়ী শান্তির পথ দেখাবে, নাকি এটি কেবল বড় কোনো প্রলয়ের আগের নিস্তব্ধতা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বিশ্ববাসীকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও লেবাননের পরিস্থিতি এবং হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থান যেকোনো সময় পৃথিবীকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।