কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নৈতিকতা, বিবর্তন এবং বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এক যুগান্তকারী আইনি লড়াইয়ের সূচনা হলো আজ। ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে মুখোমুখি হয়েছেন দুই প্রযুক্তিনির্ভর বিলিয়নিয়ার—টেসলা ও স্পেস-এক্সের কর্ণধার ইলন মাস্ক এবং চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআইয়ের’ প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান। অলাভজনক সংস্থা থেকে শত শত বিলিয়ন ডলারের মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর নিয়ে এই ঐতিহাসিক দেওয়ানি মামলার শুনানি শুরু হয়েছে।
১. অভিযোগ: মানবতার কল্যাণের পরিবর্তে ‘সম্পদ বানানোর যন্ত্র’
ইলন মাস্কের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, স্যাম অল্টম্যান এবং ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান তাঁর ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে চরম ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছেন। ২০১৫ সালে যখন ওপেনএআই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন এর মূল লক্ষ্য ছিল মানবতার কল্যাণে উন্মুক্ত এআই তৈরি করা। কিন্তু মাস্কের দাবি, অল্টম্যান সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সম্পদ বানানোর যন্ত্রে পরিণত করেছেন।
২. ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ক্ষতিপূরণ দাবি
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক ওপেনএআই এবং এর অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী মাইক্রোসফটের কাছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। তবে মাস্ক এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নিজের পকেটে নিতে চান না; বরং তিনি আদালতের কাছে দাবি জানিয়েছেন যেন এই অর্থ ওপেনএআইয়ের দাতব্য শাখায় জমা দেওয়া হয়। এছাড়াও তিনি অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় অলাভজনক সংস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
৩. ওপেনএআইয়ের পাল্টা জবাব: ‘ঈর্ষার ফল এই মামলা’
ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ মাস্কের এই দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, মাস্ক নিজেই একসময় মুনাফাভিত্তিক মডেলে যাওয়ার পরিকল্পনা জানতেন এবং সমর্থন করেছিলেন। তাদের দাবি, মাস্ক নিজে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হতে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী এআই কোম্পানি ‘এক্সএআই’ (xAI)-কে সুবিধা দিতে এই মামলা করেছেন।
৪. কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন মাস্ক ও সত্য নাদেলা
মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ ইভন গনজালেজ রজার্স জানিয়েছেন, এই মামলার গুরুত্ব অপরিসীম। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি সপ্তাহেই ইলন মাস্ক কাঠগড়ায় সাক্ষ্য দেবেন। এছাড়াও ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং মাইক্রোসফটের প্রধান সত্য নাদেলাও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। আদালত আগামী ১২ মে’র মধ্যে জুরিদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে চায়।
৫. প্রভাব: ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
একটি অ্যাপার্টমেন্টের ল্যাব থেকে শুরু হওয়া ওপেনএআইয়ের বর্তমান বাজারমূল্য ৮৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ার বাজারে (IPO) এলে এর মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে এই আইনি লড়াই ওপেনএআইয়ের আইপিও আসার পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং এআই প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের ভীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই বিচার কেবল দুই ধনকুবেরের ব্যক্তিত্বের সংঘাত নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার এবং এর বাণিজ্যিকীকরণের সীমারেখা নির্ধারণে এটি বিশ্বব্যাপী নজির হয়ে থাকবে। আগামী কয়েক দিন পুরো বিশ্বের নজর থাকবে ওকল্যান্ডের আদালতের দিকে।
তথ্যসূত্র: [রয়টার্স/এএফপি]



















