close

লাইক দিন পয়েন্ট জিতুন!

বাংলাদেশের ডিজিটাল কর্মসংস্থানে 'মেটা'র বিপ্লব, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন ও ফ্রিল্যান্সিং এখন স্মার্ট ক্যারিয়ারের নতুন নাম..

আব্দুল্লাহ আল মামুন avatar   
আব্দুল্লাহ আল মামুন
বাংলাদেশের তরুণরা প্রমাণ করেছে যে, সঠিক সুযোগ পেলে তারা বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে পারে। মেটা-র পলিসি এবং টুলসগুলো..

এক সময় যা ছিল শুধুই বিনোদনের মাধ্যম, আজ তা বাংলাদেশের লক্ষাধিক তরুণের জীবিকার প্রধান হাতিয়ার। মেটা-র মালিকানাধীন ফেসবুক বর্তমানে বাংলাদেশের ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের প্রাণভোমরা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, দেশের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ডিজিটাল মার্কেটার এবং ফ্রিল্যান্সাররা ফেসবুককে ব্যবহার করে শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাননি, বরং দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এক নতুন প্রবাহ তৈরি করেছেন।

সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণ এবং মেটা-র বিভিন্ন পলিসি আপডেটের প্রেক্ষিতে দেখা যায়, বাংলাদেশে তিনটি প্রধান খাতে ফেসবুক এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে।

১. কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য 'স্বর্ণযুগ': রিলস এবং নতুন মনিটাইজেশন মডেল

বাংলাদেশের ক্রিয়েটর ইকোনমিতে বর্তমানে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। মেটা-র সাম্প্রতিক 'Facebook Content Monetization Beta' প্রোগ্রামের আওতায় ইন-স্ট্রিম অ্যাডস (In-stream ads), রিলস (Ads on Reels) এবং পারফরম্যান্স বোনাসকে (Performance Bonus) একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের ক্রিয়েটররা এখন দীর্ঘ ভিডিওর পাশাপাশি ছোট ভিডিও বা রিলস এবং এমনকি ছবি ও টেক্সট পোস্ট থেকেও আয় করতে পারছেন।

কেন এটি বিশাল সুযোগ?

  • রিলস-এর ধামাকা: বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে রিলস-এর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। মেটা-র তথ্যমতে, গত এক বছরে রিলস এবং ছোট ভিডিওর জন্য ক্রিয়েটরদের পেমেন্ট ৮০% এরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের তরুণরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মানের কন্টেন্ট তৈরি করছেন।

  • প্রফেশনাল মোড: আগে কেবল পেজ থেকে আয় করা যেত, কিন্তু এখন 'প্রফেশনাল মোড' (Professional Mode) চালু হওয়ার ফলে সাধারণ প্রোফাইল ব্যবহারকারীরাও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারছেন।

২. ডিজিটাল মার্কেটার ও মিডিয়া বাইয়ার: উচ্চ আয়ের নতুন পেশা

বাংলাদেশের ব্যবসার ধরণ এখন 'ফিজিক্যাল' থেকে 'ফিজিক্যাল প্লাস ডিজিটাল'-এ রূপান্তরিত হয়েছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (e-CAB)-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশের ই-কমার্স ভলিউম ছিল প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার । এই বিশাল বাজার ধরার জন্য প্রতিটি কোম্পানির প্রয়োজন দক্ষ 'ডিজিটাল মার্কেটার' বা 'ফেসবুক মিডিয়া বাইয়ার'।

ক্যারিয়ার হিসেবে কেন এটি লোভনীয়?

  • মিডিয়া বায়িং: শুধুমাত্র বুস্টিং নয়, বরং মেটা-র অ্যাডস ম্যানেজার ব্যবহার করে 'ROAS' (Return on Ad Spend) নিশ্চিত করা এখন একটি হাই-ডিমান্ড স্কিল। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্স মার্কেটাররা এখন লোকাল ক্লায়েন্ট ছাড়াও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য রিমোটলি কাজ করছেন।

  • এআই স্কিলিং ইনিশিয়েটিভ: মেটা সম্প্রতি লাইটক্যাসেল পার্টনার্স (LightCastle Partners)-এর সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশে 'Meta Live Skilling' উদ্যোগ চালু করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মার্কেটারদের এআই (Artificial Intelligence) টুলস ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।

  • লোকাল পার্টনার সাপোর্ট: মেটা-র অথরাইজড সেলস পার্টনার Aleph (সাবেক Httpool)-এর সহায়তায় বাংলাদেশি এজেন্সিগুলো এখন সরাসরি পেমেন্ট এবং অ্যাডভার্টাইজিং সাপোর্ট পাচ্ছে, যা এই পেশাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

৩. ফ্রিল্যান্সারদের 'গ্লোবাল অফিস': কমিউনিটি এবং লার্নিং হাব

আপওয়ার্ক বা ফাইভার-এর মতো মার্কেটপ্লেসে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে ফেসবুক গ্রুপগুলো এখন বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রধান 'সাপোর্ট সিস্টেম' হিসেবে কাজ করছে।

  • দক্ষতা উন্নয়ন ও নেটওয়ার্কিং: 'ফ্রিল্যান্সার্স অফ বাংলাদেশ'-এর মতো গ্রুপগুলোতে লক্ষাধিক সদস্য একে অপরকে কাজ শিখতে এবং ক্লায়েন্ট ম্যানেজ করতে সাহায্য করছেন । নতুনরা এখান থেকেই গাইডলাইন পাচ্ছেন।

     
  • ডিরেক্ট ক্লায়েন্ট হান্টিং: মার্কেটপ্লেসের বাইরেও লিঙ্কডইন এবং ফেসবুক ব্যবহার করে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা সরাসরি বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ভিডিও এডিটিং, গ্রাফিক ডিজাইন এবং সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের কাজে ফেসবুকের মাধ্যমে সরাসরি অর্ডার পাওয়ার হার বেড়েছে।

  • কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট: ফেসবুকের 'Community Manager Certification' প্রোগ্রামটি বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নতুন একটি আয়ের পথ খুলে দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তাদের ফেসবুক গ্রুপ পরিচালনার জন্য এখন সার্টিফাইড কমিউনিটি ম্যানেজার খুঁজছে, এবং বাংলাদেশি তরুণরা এই সুযোগটি লুফে নিচ্ছেন।

মেটা টিমের দৃষ্টি আকর্ষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলাদেশের তরুণরা প্রমাণ করেছে যে, সঠিক সুযোগ পেলে তারা বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে পারে। মেটা-র পলিসি এবং টুলসগুলো (যেমন: Business Suite, Creator Studio) ব্যবহার করে তারা যে ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি রোল মডেল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের আয় ২.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে , যার একটি বিশাল অংশ আসবে ফেসবুক-কেন্দ্রিক কাজ থেকে। মেটা যদি বাংলাদেশে তাদের 'Bonus Program' এবং সাপোর্ট সিস্টেম আরও প্রসারিত করে, তবে এটি কেবল বেকারত্বই দূর করবে না, বরং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণে এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

ফেসবুক এখন আর শুধু 'লাইক' বা 'শেয়ার' এর জায়গা নয়; এটি এখন স্বপ্ন পূরণের এক ডিজিটাল ক্যানভাস। আপনি যদি ক্রিয়েটিভ হন, তবে কন্টেন্ট ক্রিয়েশন; যদি বিশ্লেষণী হন, তবে ডিজিটাল মার্কেটিং; আর যদি স্বাধীনচেতা হন, তবে ফ্রিল্যান্সিং—ফেসবুক প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপনার জন্য দরজা খুলে রেখেছে।

No comments found


News Card Generator