গত ২৯ জুলাই (মঙ্গলবার) বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে এবং যুক্তরাজ্যের সময় রাত ২টা ৩০ মিনিটে তিনি এই অভিযান শুরু করেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা ১০ মিনিট সাঁতরে একই দিন সন্ধ্যায় গন্তব্যে পৌঁছান হিমেল। এসময় তিনি কিলোমিটারপ্রতি গড়গতিতে লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল থেকে ফ্রান্সের উত্তর উপকূল পর্যন্ত পথ পাড়ি দেন।
চরম প্রতিকূলতার চ্যালেঞ্জে সফল হিমেল
ইংলিশ চ্যানেল, যা আটলান্টিক মহাসাগরের অংশ এবং বিশ্বজুড়ে কুখ্যাত এর বরফশীতল জলধারার জন্য, সেটি জয় করে হিমেল আবারও প্রমাণ করলেন, বাংলাদেশি সাঁতারুদের রয়েছে দৃঢ় মনোবল ও সাফল্যের সক্ষমতা। তার এই কীর্তি দেশের সাঁতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করল।
নাজমুল হক হিমেলের সাঁতারের হাতেখড়ি হয় ১৯৯৭ সালে তাঁর বাবা আবুল হাসেমের কাছে। আশির দশকের জাতীয় সাঁতারু ও নিকলী সুইমিং ক্লাবের কোচ আবুল হাসেম বর্তমানে জাতীয় সাঁতার ফেডারেশনের সাবেক সদস্য হিসেবেও পরিচিত।
চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় হিমেল প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন ১৯৯৮ সালে সাবেক সাঁতারু মো. সোলায়মানের অধীনে। পরে তিনি দীর্ঘ সাত বছর জাপানি ও চীনা কোচের অধীনে আধুনিক কৌশল ভিত্তিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদকজয়ী সাঁতারু
১৯৯৮ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে হিমেল জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় জিতেছেন ২০টি স্বর্ণ ও ১৫টি রৌপ্য পদক। ২০০৬ সালে ‘সেরা সাঁতারু’ খেতাব অর্জন করেন এবং জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ৫টি স্বর্ণ, ৪টি রৌপ্যসহ গড়েন ৬টি জাতীয় রেকর্ড।
২০০৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইন্দো-বাংলা গেমসে এক স্বর্ণ ও দুই রৌপ্য পদক জিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুনাম কুড়ান তিনি।
চীনে উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণঃ
বিকেএসপি থেকে এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করে হিমেল চীনের বেইজিং স্পোর্টস ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ২০০৯-২০১৩ মেয়াদে স্নাতক এবং ২০১৩-২০১৬ সময়ে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন শারীরিক শিক্ষায়।
এই সময় ‘অল বেইজিং ইন্টারন্যাশনাল ফরেন স্টুডেন্টস চ্যাম্পিয়নশিপ’ এ চ্যাম্পিয়ন হন এবং কুনমিং ওপেন ওয়াটার চ্যাম্পিয়নশিপে জেতেন এক স্বর্ণ ও এক রৌপ্য।
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে হিমেল দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। দেশের গরম আবহাওয়ায় ঠান্ডা পানির অভাব পুষিয়ে নিতে তিনি আইসবাথ অনুশীলনে অংশ নেন। নিয়মিত ড্রামভর্তি বরফ পানিতে শরীর ডুবিয়ে সহনশীলতা বাড়িয়েছেন।
এছাড়া প্রতিদিন নিকলীর সোয়াইজনী নদীতে ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরে অনুশীলন চালিয়েছেন।
নাজমুল হক হিমেলের এই অর্জন ব্যক্তি পর্যায়ের নয় এটি একটি জাতির গর্ব। দীর্ঘ তিন যুগ পর ইংলিশ চ্যানেল জয় করে হিমেল বাংলাদেশকে এনে দিয়েছেন নতুন পরিচয়, নতুন অনুপ্রেরণা।
তিনি প্রমাণ করলেন পরিশ্রম, সাহস ও লক্ষ্য থাকলে অসম্ভব কিছুই নয়।
হিমেলের এই ঐতিহাসিক সাফল্য উদযাপনে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সংবর্ধনার দাবি জানাচ্ছে ক্রীড়ামহল ও সাধারণ মানুষ।